বাকি কথা ‘পুনশ্চ’তে

সরোজ দরবার

 


প্রিয় সিনে-বন্ধু,
কিছু কিছু ছবি মেজাজে যেন হেমন্ত ঋতুর মতো। তার সারা গায়ে মিশে থাকে শেষ বিকেলের আলো। কোথাও বা নিঝুম দুপুরে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার ভয়। কোনও কোনও ছবি যেন কবিতায় এক অমোঘ শব্দের ব্যবহারের মতো আমাদের চমকে দেয়। সচকিত করে। সে ছবিতে যেন যত সংলাপ লেখা হয়, তারও বেশি সংলাপ না বলা থেকে যায়। যতটুকু কথিত, কথন তারও বেশি। ঠিক যেভাবে গোটা গানের মধ্যে আলাদা করে সুন্দর হয়ে থেকে যায় সঞ্চারী, ঠিক যেভাবে পুনশ্চ হয়ে ওঠে চিঠিরও অধিক, সেরকমই ভালোলাগা দেয় কিছু কিছু ছবি। যেমন দিল শৌভিক মিত্রের ‘পুনশ্চ’ ছবিটি।
‘কথা রাখার কথা ছিল, তোমারই আমার তো নয়’ ছবিতে কোত্থাও এ গান নেই, তবু সাহিত্যিক অনিমেষ মুখোপাধ্যায় (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)যখন জীবন সায়াহ্নে ফিরতে চাইলেন তাঁর প্রথম প্রেমের কাছে, তখন অবধারিত ভাবে মনে পড়ে গেল অনুরোধের আসরে বেজে ওঠা এই গান। গোটা জীবন নাইবা হল, ২৪ ঘণ্টার জন্য হলেও সংসার করার অনুরোধ নয়, আবদারই করেছিল মোহনা (রূপা গাঙ্গুলী)। সেই বিশ্বভারতীতে পড়ার সময় (যখন বসন্তোৎসবে লাখো লোকের মোচ্ছব হত না) আজ থেকে ৩৮ বছর আগে দেওয়া কথা। সেই কথা রাখতেই অনিমেষ দিল্লিতে সাহিত্য সম্মান নিয়ে ট্ট্রেনের বদলে প্লেনে কলকাতা ফিরে চুরি করলেন ২৮ টা ঘন্টা। যে সময়টুকু তিনি দিয়ে যেতে চান তাঁর ‘মন’কে, একদিন যে নামে তিনি ডেকেছিলেন মোহনাকে। জীবন তো তারপর আক্ষরিক অর্থেই পেরিয়েছে কুড়ি কুড়ি বছরের পার। মোহনার স্বামী মারা গেছে, মোহনার সামনের দু গাছি চুলে রূপোলি ঝিলিক জানিয়ে দেয় সেদিনের থেকে আজ সে আরও বেশী সুন্দর, অন্তরে। আজ সে অনেক বেশি ম্যাচিওরড, কমপোসড, ডিগনিফায়েড। অতএব এমন দিনেই হয়তো তারে বলা যায়, এমনো দিনেই মন খোলা যায়... কথা রাখা যায়। যে মন ‘মন’-এর কথা রাখার জন্য গোপনে নিভৃত প্রতীক্ষায় ছিল, তাকে তো একদিন না একদিন মোহনাতে মিশতেই হত।
যে সম্পর্ক অন্তরালের, যে সম্পর্ক একেবারেই সিন্দুকের ভিতর থাকা জড়োয়া গহনার মতো, তা যদি কোনওক্রমে প্রকাশ্যে আসে, তবে তাকে বিধ্বস্ত হতে হয়। যেভাবে হয়তো কবিতার ছন্দ কেটে কেটে দেখা হয় কিংবা শব্দ ব্যবহারের ফিরিস্তি দেওয়া হয় একপাতা জুড়ে। কিন্তু সে তো সুন্দর তার অনুভবে। কে যে কতখানি কাকে অনুভব করতে পারে, আর কে যে কতখানি সয়ে বন্ধু শব্দের স্মারক হয়ে ওঠেন তাই জানা গেল যখন অনিমেষের অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী বহ্নি (অঙ্গনা বসু)আর মোহনা মুখোমুখি হল। একজন অনিমেষের নানা চরিত্রের মধ্যে মিশে আছেন টুকিটাকিতে, আর একজন অনিমেষের জীবনের টুকিটাকিতে মিশে আছেন। একজন অনিমেষের জন্য পোস্তর বড়া রেঁধে রাখেন, অন্যজন তাঁর ওষুধের খামে লিখে দেন কোনটা খাবার আগে আর কোনটা খাবার পরে। এ যেন প্রতি ফ্রেমে মুখোমুখি এসে দাঁড়াচ্ছে জীবন আর জীবনের মর্ম। তবু অনুতাপ নয়, আক্ষেপ নয়, সব শেষে সে সবেরও গায়ে লেগে থাকে খানিকটা মায়া আর অনেকখানি বৃষ্টি।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছাড়া এই সাহিত্যিকের চরিত্রে আর কাউকেই হয়তো এমনভাবে মানাত না। তবে তাঁর কৃতিত্ব এ ছবিতে ২০০ ভাগ। ছবি মুক্তির আগে রূপা গাঙ্গুলী বারবার করে বলেছিলেন, সৌমিত্রের থেকেই ছবিতে সংলাপ ব্যবহার থেকে প্রোফাইল সব কিছু শিখেছেন তিনি। এ ছবিতে তাঁর অভিনয়ে যদি কিছু ভালো থাকে তবে তার কৃতিত্ব সৌমিত্ররই। এ ছবি তো রূপারই। প্রায় প্রতি ফ্রেমে তিনি আছে, কিন্তু তিনি আছেন বলেই প্রতি প্রেম এত সূক্ষ্ম অভিব্যক্তিতে ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে। ম্যাচিওরড, কমপোসড, ডিগনিফায়েড-এর ব্যাখ্যা এত গভীর করে শুধু চোখ দিয়ে আর কেইবা ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। রূপার মেয়ে পর্ণা হয়ে সায়নীর ভূমিকা ছোটই। সে যে প্রশ্নটা তুলেছে, বাবাকে ঠকানোর সেই প্রশ্ন, তিতলী ছবিতে আর এক প্রসঙ্গে তুলেছিলেন কঙ্কনা সেনশর্মা। একটু স্মার্ট আরবান কৈফিয়ৎ তলব করা মেয়ে থেকে মায়ের অনুভবের সঙ্গী হয়ে ওঠার জার্নিটা সায়নী স্বল্প পরিসরেই চমৎকার কাজে লাগিয়েছেন।
এ ছবি তীব্র বুদ্ধিমত্তার ফুলঝুরি জ্বালায় না। এ ছবি কমেডি হতে গিয়ে ভাঁড়ামো আর ইন্সপায়ারড হতে গিয়ে রিমেক হয়ে দাঁড়ায় না। এ ছবির পরতে পরতে পরিচালকের দড় হয়ে ওঠার লক্ষণ নেই। কারও হাতে সাজা পানে যেমন সেই মানুষটা মিশে থাকে, এখানে সেভাবেই মিশে আছেন পরিচাল। যিনি খুব সন্তর্পনে বাঙ্গলা ছবিকে সেই অভিমুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করলেন, যে পথে একদা ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেনের মতো পরিচালকরা হেঁটেছিলেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি হালফিল সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে যে সমালোচনাকুটিল ভুরু নিয়ে ফেরার বাস ধরেন, এ ছবি তা হতে দেয় না। বরং শ্রাবণের ধারার মতো শেষ দৃশ্যের ঝরে পড়া বর্ষা বহুদিনের বিরক্তি ধুইয়ে দেয়। অন্তত আমার তো তাই হয়েছে। ঊনিশে এপ্রিল, উৎসব, পারমিতার একদিন, আবহমান ছবিগুলো যেমন চার দেওয়ালের ভিতরে থেকেই অদ্ররশ্য ডানায় উড়ান দিয়ে ছাড়িয়ে যেতে পারত অনেকটা দূরের সীমানা আবার একইসঙ্গে ছুঁয়ে থাকত মনের গহন প্রদেশ, এ ছবির চরিত্রও যেন সেই মুখে।
একদিন এক রাত প্রেমের সাথে খেলা হলেই, এক দিন এক রাত মৃত্যুকে অবহেলা করে যায়। অনিমেষের কথা রাখা যখন মোহনা খুঁজে পায়, মোহনার গিলে নেওয়া একদলা ব্যাথা যখন বহ্নিতেই বন্ধু খুঁজে পায়, আর বৃষ্টি এসে যখন মা-মেয়েকে এক করে ভিজিয়ে দিয়ে যায়, আমরা যেন বুঝি জীবনের যতটুকু চিঠি আমরা পড়তে পেরেছি, বাকি থেকে গেছে তারও বেশি। সে সব হয়তো লেখা থাকে এরকম ‘পুনশ্চ’তেই। আমাদের মনে পড়ে, ‘যে ব্যাথা মুছিতে এসেপৃথিবীর মানুষের মুখে/আরো ব্যাথা-বিহ্বলতা তুমি এসে দিয়ে গেলে তারে-/ ওগো প্রেম সেসব ভুলে গিয়ে কে ঘুমাতে পারে!’
ইতি
সরোজ দরবার

পুনশ্চ- আমাদের হলে হলে সিটি মারার অভ্যেস আছে কিন্তু হাততালি দেওয়ার রেওয়াজ খুবই কম। পারলে এ ছবি দেখার শেষে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানাবেন।
...................................................
ছবি-পুনশ্চ
অভিনয়- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রূপা গাঙ্গুলী, অঙ্গনা বসু, সায়নী ঘোষ
পরিচালনা- শৌভিক মিত্র
সংগীত- দেবজ্যোতি মিশ্র


আপনার মতামত জানান