বুনো হাঁস

সরোজ দরবার

 


৭.৫/১০


রসগোল্লা, মিষ্টিদই আর রবীন্দ্রসংগীত ছাড়াও বাঙালির কুলুঙ্গিতে আরও কিছু আবেগ-বিগ্রহ তোলা থাকে। যেমন- ওপার বাংলার জন্য নাড়ির টান, সারাজীবন কিচ্ছু না চাওয়া বিধবা মায়ের শেষ বয়সের হঠাৎ আবদার, সংসারের জোয়াল টানতে টানতে শুকিয়ে যাওয়া দিদির মতো বৌদি, বাপ ঠাকুদ্দার বালি খসে যাওয়া বাড়ি, না হয়ে উঠতে পারা প্রেম এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত যুবকের না শুঁয়োপোকা না প্রজাপতি হয়ে উঠতে পারা ও অবশেষে দুধমাখা ভাত কাকে খেলে খোকনরে তুই ঘরে আয়...। এসব বাঙালির বড় প্রিয়। উইকএন্ড পার্টি আর বিরিয়ানি করে করে হয়রানি মাথাচাড়া দিলে, ছুটির দুপুরে আলু পোস্তর ভিতরে যেমন অচেনা একটা স্বাদ পাওয়া যায়, বুনো হাঁস ছবিটাও সেরকম একটা স্বাদ নিয়ে আসে। কেন তা ক্রমশ প্রকাশ্য।

দেব নয়, সমরেশ
এ ছবিতে অভিনয় করেছেন সুপারস্টার দেব, ছবির হিরো কিন্তু কাহিনি তথা কাহিনিকার সমরেশ মজুমদার। সিরিয়ালের ইলাস্টিকবৃত্তির সময়ে যখন কাহিনির ঠাসবুনোট ব্যাপারটাই ইলিশের স্বাদের মত বিস্মৃতপ্রায় এবং রিমেকের দৌলতে সিনেমাটা যখন মূলত অনুবাদ শিক্ষার ক্লাসের পোশাকি নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন সমরেশ মজুমদারের গল্প একটা দারুণ হাঁফ ছাড়ার অবসর। জমাটি পুজো উপন্যাসে রাত কাবারের মতোই চুম্বকের টান কাহিনির পরতে পরতে। এবং গৌরচন্দ্রিকায় যে সব সোনার জলে ধোয়া নস্টালজিয়ার গহনার কথা উল্লেখ করলাম, তাদের গা থেকে কিন্তু মোটেও জল টল গড়িয়ে ফ্রেমগুলোকে গ্যাদগ্যাদে করে তোলেনি। বুনো হাঁসের তাই নিজস্ব গতি আছে। কাহিনির জোরেই গোটা কাঠামোটা এমন শক্তপোক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে, এদিক ওদিক টাল খাওয়ার তেমন জো নেই। তাই দেব নন, অনেকদিন পর একখানা বাংলা ছবিতে কাহিনিই সুপারস্টার। কাহিনিটা কি? এক লাইনের ব্রিফ- ‘অমল’ ধবল পালে নোংরা লাগার গল্প। বাকিটা পর্দায়।



লে ছক্কা
সমরেশের কাহিনি জমাট, এ নিয়ে বেশি বাক্যব্যয় বৃথা। ‘বুনো হাঁস’ আর দর্শকের মধ্যে একটা বেমানান হাইফেন হয়ে বসে আছেন যিনি তিনি দেব। এ ছবি কি দেবের ছবি? নাহ, উল্টোটা। দেব এ ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁকে মাথায় রেখে চরিত্র লেখা হয়নি, চরিত্রকে মাথায় রেখে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। অর্থাৎ গড়পড়তা উলটপুরাণের বাজারে একটা সোজা পুরাণ। ‘চাঁদের পাহাড়’-এ কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় দেবকে দিয়ে সংলাপ কম বলিয়েছিলেন, বিশেষত বাংলা কথা। টোটকাটা কাজে লাগিয়েছেন অনিরুদ্ধ চৌধুরীও। তবে এই কম কথন আর অভিব্যক্তিতে চরিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় আখেরে লাভবান হয়েছেন দেবই। এ ছবিতে তাঁর কাজ অন্তত তাঁর মহানায়কীয় হালফিল বদনামের ক্ষতস্থানে খানিকটা মলম লাগাবে। মোদ্দা কথা, দেব এখানে চরিত্রানুজায়ী ভালো অভিনয় করেছেন। সুতরাং ঐ বিসদৃশ হাইফেনটা মন থেকে তুলে নিতে পারেন। তবে বাংলা বলায় যে তাঁকে আরও যত্ন নিতে হবে সে আমার থেকে দেব নিজেই হয়তো ভালো জানেন। ( পড়েছিলেম, উত্তমকুমারের উচ্চারণ দোষ কাটানোর জন্য কেউ নাকি তাঁকে রোজ সঞ্চয়িতার একটা করে কবিতা পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তা এ রিভিউয়ের কি ধক আছে যে দেবের কান অবধি পৌঁছবে? তবু কানাকানি একটু হতেই পারে। পরামর্শটাও আমার নয়, আর যাঁকে দেওয়া হয়েছিল তাঁর উচ্চারণ নিয়ে বাঙ্গালিদের পরবর্তীকালে কোনও অভিযোগও নেই।)

সোহাগ ও সোহাগ

একজন ছবির স্ট্রং পয়েন্ট, অন্যটি উইক। প্রথমজন সোহাগ সেন। অন্যটি হল এ ছবিতে শ্রাবন্তীর অভিনীত চরিত্রটি। সেই নন্দর মায়ের পর মাঝে হৃদমাঝারে ছবিতে ছোট্ট একটি ভূমিকায় দেখেছিলেম সোহাগ সেনকে। তারপরে এই অমলের মা। মা যদি সংসারের হালটা ধরে থাকেন, তবে এ ছবিতে অভিনয়ের হালটাও তিনিই ধরে আছেন। তাঁর অভিনয়কে বিশেষণ দেওয়া ভীষণ কাজ, এটুকু বলতে পারি, সোহাগ সেনের অভিনয় যেন আরও বেশি করে পর্দায় আসে। অন্যদিকে এ ছবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা শ্রাবন্তীর অভিনীত সোহাগ। চরিত্রটা কাহিনির সব শক্ত শক্ত মুহূর্তদের দুর্বল করে দেওয়ার জন্য তৈরি। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্তত গয়নার গা থেকে জল গড়িয়ে গেছে। এত ভেজা ভেজা চোখের পাতায় নয়, সোহাগ যদি আর একটু খাঁ খাঁ শূন্যতার দৃষ্টি নিয়ে দর্শকদের দিকে তাকাত, তবে হয়ত দুর্বল হয়ে পড়া মোক্ষম হয়ে উঠত পারত। হয়নি। তনুশ্রী চক্রবর্তীও বেশ কাজ করার পরিসর পেয়েছেন। কাহিনীর রাশ অনেকটা সময় তাঁর হাতে থাকলেও তিনি এমন কিছু করেননি যা আলাদা করে উল্লেখ্য। তিনি চরিত্রের মাপ মতোই। যেরকম চরিত্রের প্রতি সুবিচার করেছেন অরিন্দম শীল, শঙ্কর চক্রবর্তী, মুনমুন সেন। তবে কড়ায় গন্ডায় পুষিয়ে দেন অনিন্দ্য আর সুদীপ্তা চক্রবর্তী। অনিন্দ্যর অভিনয় এমন একটা সহজ স্তরে নেমে আসে, যা অতিক্রম করে যাওয়া কঠিন। আর সুদীপ্তা? আমাদের ঘরের আটপৌরে বৌদিটার মধ্যেও যে একটা অসাধারণ নারী আছে, যাকে এক দু পলকই চোখে পড়ে, বাইরে গেলে সুগন্ধী আনতে ইচ্ছে করে, সেই বৌদিদের কথা ভাবতে গেলে অন্তত সুদীপ্তার মুখই এবার থেকে প্রথমে মনে পড়বে। বিকেলে ভোরের সর্ষেফুল কেন, তিনি একাই হাউসফুলে দেখাতে পারেন, সুযোগ পেলে। কে জানে সে সব সুযোগরা কোথায় থাকে!
অনিরুদ্ধ অ্যান্ড কোং
এই তালিকায় সবার প্রথমে থাকবেন সিনেমাটোগ্রাফার হরেন্দ্র সিং । তারপরেই শান্তনু মৈত্র। এঁদের যুগলবন্দি এমন একটা মায়া তৈরি করে ছবির পরিসরে যা অনেকক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। পদ্মার পাড় থেকে ঢেউ যে বুকে এসে লাগে আর শীতলপাটির নীচে ছোঁয়া যায় ভেজা মাটির মন, তার জন্য এঁদের কৃতিত্ব অনেকখানি। এবং অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী স্বয়ং। এ ছবি তাঁকে রিডিফাইনড করল। প্রত্যাশা আর প্রত্যাখানের বেশ খানিকটা অধ্যায় পেরিয়ে এসে অনিরুদ্ধ এমন একটা ছবি উপহার দিয়েছেন, যা টানটান, গতিময়, নান্দনিক এবং বাঙালির ভালো লাগার। আর যাই হোক, অনিরুদ্ধর ‘বুনো হাঁস’-এ এবার আর কোনও অন্তহীন চ্যাট-চ্যাট-এ অনুরণন নেই। সুতরাং হলমুখী হতে পারেন স্বচ্ছন্দেই।
.....................
ছবি- বুনো হাঁস
পরিচালক- অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী
অভিনয়- দেব, সোহাগ সেন, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, অনিন্দ্য, শঙ্গকর চক্রবর্তী, গার্গী রায়চৌধুরী, তনুশ্রী
সংগীত- শান্তনু মৈত্র


আপনার মতামত জানান