এক পৃথিবী জীবনের রূপক ‘ফ্যানি’

অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়

 


সেই কোন কালে মানুষ যবে থেকে ‘ভালোবাসা’কে গর্ভে ধারণ করেছে আর পৃথিবী গ্রহে যবে থেকে ‘শিল্প’ নামে এক পাগলামো শুরু হয়েছে তবে থেকে শিল্প তার কোলে কাঁখে চড়িয়ে ভালোবাসাকে কতরকম ভাবে যে মানুষ করেছে... কিন্তু ভালোবাসা আসলে চরম এক ‘অ্যাবসার্ড’ অনুভূতি বই তো নয়! কারণ তাকে তো আমরা না পাই চাক্ষুষ করতে না পাই ছুঁতে না পারি তুমুল ভাবে জাপটাতে- আসলে তো হাওয়ার যমজ ভালোবাসা- তবু এই বায়বীয় অস্তিত্বময় এক অনুভূতির জন্যই মানুষ যুগের পর যুগ ধরে মরেছে, মনোবিকারে ভুগেছে, আবার পারিজাতের ফল কিংবা সাত রাজার ধন এক মানিকের যত্নে নীল মখমলে মুড়ে রাতের পর রাত কাটিয়েছে... আর যারা এগুলো পারেনি করতে- নাড়ি ছেঁড়া সন্তান হারিয়ে গেছে যেন এমন ভাবে তারা খুঁজেছে, শুধুই খুঁজেছে, পায়নি আবার খুঁজেছে... আর খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে গোটা জীবনটা পথেই কাটিয়েছে তারা- ঘরে আর ফিরতে পারেনি! আর এমন ঘরে না ফেরা কতগুলো মানুষকে নিয়েই আরো অনেকবারের মতই আর এক বার তৈরী হল আর একটি ছবি... “ফাইন্ডিং ফ্যানি”।
প্রকৃতি মুখ ধুতে এসে তার সমস্তটুকু রূপ ফেলে গেছে আরব সাগরের জলে- গোয়ার কোনও এক পকেটে লুকিয়ে থাকা এক টাকার কয়েনের মত এমনই একটি গ্রাম পোকোলিম- যেখানে কয়েকঘর মাত্র সংসারের বাস আর সেইসব সংসারের মানুষগুলো একে অপরের দিনগত পাপক্ষয়ের সাথে এমনই ওতপ্রোত জড়িত- কারণ না জড়িয়ে থাকলে তারা হয়তো বুঝতেও পারবেনা যে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো জীবন ওই নিস্তরঙ্গ গ্রামেও আছড়ে পড়ে! কারণ পোকোলিম যেন এই গ্রহের কোনও স্থান নয়, যেন অচিনপুর কোনও, যা থেকেও নেই যেন, আর এমনই এক নিঃসঙ্গতার জাবর কাটা রাতে গ্রামের আধপাগল পোস্টমাস্টার ফার্ডির কাছে এসে পৌঁছয় এক চিঠি যা কিনা আসলে তারই যৌবনের প্রেমিকা স্টেফানি ফার্নান্ডেজ্‌কে লেখা তার প্রেমপত্র যা ছেচল্লিশ বছর পরে ফিরে এল তার কাছে ‘আনডেলিভার্ড’! এবং এরই পরে ফার্ডি তার গোড়ালির বয়সী বন্ধু অ্যাঞ্জির সাহচর্যে বেরোয় স্টেফানি আদরে ফ্যানিকে খুঁজতে আর তাদের সঙ্গ দেয় অ্যাঞ্জির ছিটিয়াল শাশুড়ি রোজি আর গাড়ির চালক এবং অ্যাঞ্জির গোপন তথা পুরনো প্রেমিক স্যাভিও আর গাড়ির মালিক চিত্রকর ডন পেদ্রো আর শুরু হয় তাদের এমন এক অ্যাবসার্ড রোড ট্রিপ যা কোথাও গিয়ে শেষ হওয়ার নয় শুধু মাইলস্টোন ছুঁয়ে ছুঁয়ে বিশ্রাম নিতে নিতে সারাটা জীবন ধরে গড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার এক অলীক যাত্রা...
বর্তমান বাজারের হিন্দি ছবিতে এমন বিষয় ভাবনা সাহসিকতার পরিচায়ক বইকি! কারণ যেখানে গল্প ব্যতীত অন্যতর ভাবনা দর্শকের পাকস্থলীতে দ্রুত পাচিত হয়না। যেখানে এই ছবিতে শুরুতে কি হতে চলেছে এমন ভাবে গল্পের একটি স্থায়ী গেয়ে অন্তরা এবং সঞ্চারীতে গল্প ব্যতিরেকে শুধুই চলে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ যা কিনা সততই কঠিন কাজ। তবে এ কাজের জন্য পরিচালক চিত্রনাট্যকারকে পিঠ চাপড়ানি দিলেও যে বিষয়টা খুঁতখুঁতানি জাগিয়ে দিচ্ছে তা হল কিছু চরিত্রের অতীত এবং বর্তমান অস্তিত্বের অস্বচ্ছ ভিত্তি এবং তারা হল অন্যই এবং তার শাশুড়ি রোজি।
রোজির ছেলে গাবোর সাথে অ্যাঞ্জির বিয়ে হয় এবং বিয়ের দিনেই ওয়েডিং কেকের ওপরের প্লাস্টিকের স্ট্যাচু গলায় আটকে সে মারা যায়। আর তারপর থেকেই সংসারে শুধু রোজি আর অ্যাঞ্জি। এদিকে রোজির স্বামীও বহুদিন হল নেই। অনেকে জানে যে সে সত্যিই নেই কিন্তু আসল সত্যি হল সে রোজিকে ছেড়ে অন্য এক নারীর সঙ্গে বহুদিন হল বসবাস করছে। আর এ সত্যি জানে কেবল রোজি নিজে এবং ফার্ডি। কিন্তু তবু রোজি এবং অ্যাঞ্জির এই বহমান একাকীত্বের যন্ত্রণা যেন ঠিক ফুটে উঠলনা আর তাই চিত্রনাট্যের এটুকু গাফিলতি সরে গিয়ে তাদের অতীত এবং বর্তমানের ভিত্তি যদি আরেকটু বিস্তারিত থাকত তাহলে প্রাঞ্জল হত আরও একটু বেশী এবং তলে তলে একটি কাহিনীও বেরিয়ে আসত।
তবে চিত্রনাট্যের এটুকু চ্যুতি আমরা নিজেরাই সরিয়ে রাখিনা কেন! কারণ যেখানে বাঁকে বাঁকে রয়েছে জীবনের কালো রসে জারিত এমন মিছরির মত হাস্যরস, এমন প্রাণছোঁয়া পরিস্থিতি, এমন মনদোলানো কথা আর মৃত্যুকে যে মর্বিডিটির পরাকাষ্ঠা হওয়া থেকে এমন ভাবে মুক্তি দেবে তা কে ভাবতে পেরেছিল! কে বুঝতে পেরেছিল যে আমরা আবার নতুন করে বুঝতে পারব যে ওই জিনিসটিই কেবল খুঁজলে পাওয়া যায় কেননা ওটিই কেবল সত্যি...



রোজির বেড়াল ফার্ডিকে কামড়ে দেওয়ায় সে রেগে গিয়ে গাড়ির জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় তাকে আর এক বিশাল গাছে ধাক্কা খেয়ে তৎক্ষণাৎ পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটে তার। কিন্তু পরে ওই মৃত বেড়ালই রোজিকে বুঝতে সাহায্য করে যে সে আসলে ভালোবাসে ফার্ডিকে! আর ওই খ্যাপাটে চিত্রকর ডন পেদ্রো যে সারা জীবন একজন মোটা মহিলার ন্যুড পেইন্টিং করবে বলে ঘুরে বেরিয়ে শেষে অতিগুরুনিতম্বিনী পৃথুলা রোজিকে তার মডেল হিসেবে বেছে নেয় আর যার গাড়িতে চড়েই তাদের ওই অলীক অভিযান... পিস্তল নিয়ে টানাটানি করতে গিয়ে গুলি ছুটে গিয়ে সে যে মারা গেল আর তারপর গাড়ির দরজা ভেঙ্গে সে যে পড়ে গেল জলে কেউ তো তা জানতেও পারলনা! আর এখানেই বাকি চারজনের জীবনে সে যে আদপে এক অনুঘটক, যার প্রয়োজন ওই ওই পর্যন্তই তা প্রতিষ্ঠা পায় আর প্রতিষ্ঠা পায় মৃত্যুর রঙ কালো নয় সাদা!
কিছু আলোকসামান্য মূহুর্তের জন্ম দেয় এ ছবি... যেমন স্বামীর কফিনের সামনে বধুবেশে দাঁড়িয়ে অ্যাঞ্জি পিছনের আয়নায় তার উড়ন্ত স্কার্ফ- কিংবা গাড়ির পেছনে বেড়ালটি মৃত অবস্থায় চোখ বুজে শুয়ে আর তার সামনে এক ঝুড়ি মাছ তাকিয়ে আছে কারণ তারাও মৃত- আর সেই যে দূরে টিলার দিকে চেয়ে একটা উঁচু ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে চারজন আর টিলার ওপরের পায়ে চলা পথ বেয়ে এগিয়ে চলেছে একদল মানুষ একটু আগের ফ্যানি বলে ভুল করা এক মহিলাকে কবরস্থ করার জন্য আর টিলার পিছনে সূর্য ডুববে ডুববে করছে, ছায়া নামতে চাইছে কিংবা দিগন্ত হারিয়ে ফেলা এক মাঠের মধ্যে অ্যাঞ্জি ও স্যাভিওর মিলন... এবং আরও কত অসামান্য দৃশ্যকল্পে পরিপূর্ণ যে!
তবে একটা মুশকিল হল অর্জুন কাপুর বাদে এ ছবিতে অন্যেরা অভিনয় করেছেন কিনা বুঝতে পারা গেলনা! নাসিরুদ্দিন শাহ্‌ এবং পঙ্কজ কাপুরের সম্বন্ধে লিখতে বসলে এ লেখা আর শেষ করা যাবেনা অবধারিত, তাই শুধু এটুকু বলি “আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার পরে”... ওই আধপাগলা খ্যাপাটে লোকের চরিত্রে ‘বিহেভ’ করার জন্যই ওই মানুষ দুটো অভিনয় শিল্পকে বেছে নিয়েছিলেন কিনা জানা নেই! মেদময়ী ডিম্পল কাপাডিয়া রাশি রাশি অক্সিজেন শুধু ছড়িয়েই গেছেন, ছড়িয়েই গেছেন... আর আমরা শ্বাস নিতে নিতে প্রাণবায়ু উদ্বৃত্ত হয়ে পড়েছে... আর ওই মৃত মার্জারকে নেহাতই নিরাসক্ত ভঙ্গিতে কোলে করে এনে গাড়ির পেছনে লুকিয়ে রাখার পরে সিটে বসে নিজের মুখটাকে লুকিয়ে চোখের ঝিনুকে জলের গলে যাওয়া মুক্তোটাকে গড়িয়ে পড়ে যাওয়া থেকে আটকালেন যেভাবে শুধুমাত্র ওইটুকু দৃশ্যখন্ডের জন্যই গোটা ছবিটা মনে রাখবে দীপিকা পাড়ুকোনকে আর বাকি যা করলেন তার জন্য ভাসিয়ে দেওয়া এক সমুদ্র অভিনন্দন...
শেষ কবে এবং কোন ছবিতে চারিদিকে এত রঙ এত এত এত সবুজ দেখেছি মনে পড়ছেনা! কুর্নিশ জানাই চিত্রগ্রাহক অনিল মেহেতাকে। সম্পাদক স্রীকর প্রসাদের কাজও প্রশংসার্হ। একই কথা আনাইতা শ্রফ আদাজানিয়া সম্বন্ধেও যার পরিকল্পিত পোশাক রঙের প্যালেটে আরও কয়েকমাত্রা যোগ করেছে। দুর্ভাগ্যবশত নাম ভুলে গেলেও শিল্প নির্দেশক এবং সুরকারের কাজ গোয়ার সমস্ত রকম স্বাদ সাজিয়ে দিয়েছে আমাদের পাতে।
সবশেষে পরিচালক হোমি আদাজানিয়াকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন গতানুগতিকতার এই আবহে প্রকৃত অর্থেই গতানুগতিক এক বিষয় বেছে তাকে এমন গড্ডালিকা প্রবাহের বাইরে নিয়ে আসার জন্য। জীবনের ভেতরে ডুবুরি ঝাঁপ দিয়ে ঝিনুক সেঁচে মুক্তো তুলে আনার জন্য কিংবা অন্তত চেষ্টাটুকু করার জন্য। আর তাই এ ছবি এমনই এক কুয়াশা মাখা বেহালার ছড়ে টান দিয়ে শেষ হয় যার জন্য বুকের মধ্যে এক অপার কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হলেও তা স্বস্তি দেয়- এই অশান্ত জীবনে যার বড় প্রয়োজন...

বড়ই প্রয়োজন!




সিনেমাঃ- ফাইন্ডিং ফ্যানি
পরিচালনাঃ- হোমি আদাজানিয়া
অভিনয়েঃ- নাসিরুদ্দিন শাহ্‌, ডিম্পল কাপাডিয়া, পঙ্কজ কাপুর, দীপিকা পাড়ুকোন, অর্জুন কাপুর

আপনার মতামত জানান