চলচ্চিত্র আলোচনা - ‘চতুষ্কোণ’

সরোজ দরবার

 


ভরা শরতে বসন্তের গান কি একটু বেমানান? হতে পারত, যদি প্রেক্ষাপটটা তেমন প্রাচুর্য এবং ঐশ্বর্যে ভরা না হয়। কিন্তু সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘চতুষ্কোণ’ শরতের আগমনীর ভিতরই অনায়াসে শুনিয়ে দিতে পারে বসন্তের গান। সে বসন্ত অবশ্যই বাংলা ছবির। সে বসন্ত অবশ্যই বালকবেলা থেকে সাবালকত্বে পা দিয়ে অনুভবের বসন্ত। চতুষ্কোণের হাত ধরে যার স্বাদ নিতে পারে বাঙালি দর্শক এই শরতেই।


চার এক্কে এক পরিচালক
এক ছবির ভিতর চার পরিচালক। চার জনেই আলাদা আলাদা ছবির গল্প দেবেন। চার কিসিমের কল্পনায় তৈরি হবে ছবির শরীর।কিন্তু চতুষ্কোণের পরিচালক তাঁর চরিত্রের মুখেই বলিয়ে দেন, এ ধরনের কাজের স্মৃতি বাংলা ছবির বাজারে তেমন সুখকর নয়। তবু চার পরিচালকের কনসেপ্ট থেকে বেরিয়ে আসেননি সৃজিত। কেননা এখানে পরিচালকের নামতাটা একটু অন্যরকম। চার এক্কে এখানে এক পরিচালক। ছবিতে চারজন পরিচালক আছেন ঠিকই। আছেন চরিত্র হয়ে। প্রযোজকের শর্ত মেনে সেই চার চরিত্র একটি করে ছবির গল্প ভাববেন। চারটি গল্পই বাঁধা থাকবে মৃত্যুর থিমে।কিন্তু সেখানে থেমে গেলেন না আসল পরিচালক। কোন মৃত্যুটা সেই সুতো হয়ে আদ্যোপান্ত ছবিকে ঘিরে থাকবে, সেই তাসটি তিনি তুলে নিলেন নিজের হাতে। ফলে চেনা চারের ছক থেকে বদলে গেল এ ছবির ঘরানা।


সৃজিতের জিতে যাওয়া
চার পরিচালকের এক মুঠো ছবি তো বাঙালি দর্শকের হাতে ছিলই, এক পরিচালকের চারমুঠো ছবিও সে পেয়েছে। আবার একাধিক গল্পের এক থেকে অপরটিতে গড়িয়ে গিয়ে হাইপারলিঙ্ক ছবি হয়ে ওঠা ছবিও হালফিল প্রাপ্তি হয়েছে তার। কিন্তু চারের বিন্যাস বজায় রেখে আখ্যানের এমন ভাঙাগড়ায় একজন পরিচালকের এক সৃষ্টির নজির সম্ভবত দর্শক খুব বেশি পায়নি। ছবিতে দীপ্ত (চিরঞ্জিত চক্রবর্তী), শাক্য (গৌতম ঘোষ), তৃণা (অপর্ণা সেন) এবং জয়ব্রত(পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়)সেই চার পরিচালক হলেও, আসল পরিচালক একজনই। এ ছবিতেও তিনি ন্যারেটিভকে নিয়ে খেলেছেন নিজস্ব খেলা। তবে এবারের খেলাটা ছিল বোধহয় সবচেয়ে কঠিন। অথচ মা ঠাকুমারা যেমন অনায়াসে নানা রঙের উলের বয়নে গড়ে তোলেন পোশাক, সৃজিতও যেন তেমনয়ই নিপুণ দক্ষতায় ইন্টারটেক্সচুয়ালিটির কাজ। tandem narrative এর ব্যবহার তাঁর কাজে আগেও এসেছে। এবার তাঁর fractured tandem এর ব্যবহার যে কোন সিনেমাপ্রেমীর কাছেই লোভনীয়। এই দিয়েই সৃজিত তৈরি করেছেন তাঁর কাঙ্খিত সাসপেন্স। দর্শক আগাগোড়া ছবির ভিতরে মগ্ন থেকে দেখতে থাকেন কীভাবে পরিচালক তাঁর লাটাই থেকে সুতো ছেড়ে আবার গুটিয়ে নিচ্ছেন। কোনও মোবাইলের আওয়াজই ‘ডিস্ট্র্যাকশন’ আনে না, থ্রিলারের ধর্ম মেনে নে যেটুকু যা দৃষ্টি ঘোরানোর কাজ, তাও পরিচালকই সমাধা করেন। আর এখানেই সৃজিতের জিত। তত্ত্ব কিংবা টেকনিক তো নয়, ছবির এসেন্স দিয়েই তিনি পৌঁছে যান দর্শকের কাছে। সমস্ত বিশ্লেষণের চেষ্টা সেখানে নিছকই কলমের খেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, যখন টোন বদলে বদলে পরিচালক পালটে দেন ছবির রঙ। দর্শকের অনুভবেরও।


চোখের তারায় আয়না ধরো
স্বপনচারিণীকে চিনিতে না পারার বাঙালি বেদনা তার একান্ত প্রেম। সৃজিতের ছবিও থ্রিল, সাসপেন্স, সংগীত যে বিষয়ের কাঠামোর উপরেই দাঁড়িয়ে থাক না কেন, ডাকের সাজের মতো তার শরীরে থাকে প্রেম। স্বভাবে তা উচ্চকিত নয়, মেজাজে আবেগসর্বস্ব নয়, বরং ফুরিয়ে আসা বিকেলের মতো মায়াময়। গাঢ় সংলগ্নতা সত্ত্বেও তা যেন জারি রাখে তার আলগোছে ভাবখানা। ফলে ছবি এগোয়। দর্শক মজে যান রহস্য উদ্ধারে কিংবা গানে। আর এ সবের আড়ালে একেবারে সন্তর্পণে সে এসে দাঁড়ায় জানলাটির কাছে। নিরুচ্চারে বলে, ভালোটি বাসিব। এ অটোগ্রাফ সৃজিতের নিজস্ব। নানা ঘরানার ভিতরেও সেলুলয়েডের কপালে তিনি পরিয়ে দিতে প্রেমের কাঁচপোকা টিপ। এ ছবিতেও তা আছে চোখের তারায় আয়না ধরে। হয়তো কাছে থেকেও দূরে। এক মুহূর্তের সত্যিকে সম্বল করেই চরিত্রের মুখ দিয়ে পরিচালক তাই শুনিয়ে দেন- সমুদ্র কাছেই ছিল, আমরাই বুঝতে পারিনি।


সৃজিতের চিরঞ্জিত
শিল্প- বাণিজ্য- বিনোদনের ত্রিকোণ সম্পর্কের জোরে মাঝে মধ্যেই দ্বন্দ্ব বাধে। অথচ বাণিজ্যের বদান্যতা না পেলে বিনোদনের শিল্পও যে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। তবু এ এক অলিখিত বিভাজন। পোস্টবক্স নম্বরের নাগরিক সীমার বাইরে যারা বিনোদনের সম্রাট তাঁরাই শহরবৃত্তে নিঃসঙ্গ সম্রাট। বাঙালির তথাকথিত সাংস্কৃতিক কাব্যে উপেক্ষিতা। সেই বিধিলেখা শিরোধার্য মেনে নিয়েই যেন চিরঞ্জিত চক্রবর্তীর মতো অভিনেতা ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাড়িওয়ালি’র পর থেকে এতদিন অব্যবহৃত রয়ে গেলেন। অথচ সৃজিত যে চিরঞ্জিতকে দেখিয়ে দিলেন, তিনি মেলোড্রামাটিক নন, অভিব্যক্তি-সংলাপের পরিমিতিতে ঠিকঠিক।অলীক বিভাজনে কাঁটাতারটিকে সরিয়ে দিতে পারলে এহেন অভিনেতা বাংলা ছবিকে ‘বউ গেলে বউ পাওয়া...’ মার্কা সংলাপের অতিরিক্তও কিছু দিতে পারতেন। ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর ছবিতে এ বিভাজনকে সচেতনভাবে সরিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তৈরি সৃজিতের এ ছবিও মিলে গেল সেই মেলবন্ধনে।



পুজোর উপহার...
ন্যারেটিভের ভাঙাগড়া, থ্রিল, সাসপেন্স, ‘ঘরে বাইরে’ থেকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র ক্রস রেফারেন্স ব্যবহার এহেন বহু পরিচালন মুন্সিয়ানার সাক্ষী থাকা তো বটেই, আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় এ ছবির সিনেমাটোগ্রাফির কথা। আফ্রিকা বা মিশর না পেলেও যে লেন্সের নন্দনতত্ত্ব বজায় থাকে তা দেখিয়েছেন সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। আর সম্পাদনাতে সেই নান্দনিকতাকে গতি দিয়েছেন রিবিরঞ্জন মৈত্র। দুটো ছবির ব্যবধানে সৃজিতের এ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন অনুপম রায়। তাঁর গানগুলিকে কাহিনির সমান্তরালে সুন্দর ব্যবহার করেছেন পরিচালক। এ ছবিতে পরিচালক বোধহয় নিজেকেই বসিয়েছিলেন নিজের প্রতিপক্ষ করে। তাঁর হাত থেকেই তাই উঠে এসেছে এমন এক বাজিমাতের দান, যা ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর সৃজিতকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে। সে চ্যালেঞ্জে সৃজিত যত জিতবেন বসন্তের গান ততোই মানানসই হয়ে উঠবে। হ্যাঁ এই শরতেও। একজন পরিচালকের পুজোর উপহার ভালো ছবি ছাড়া আর কীই বা হতে পারে। আপনাকে শুধু হলে পৌঁছে সেই উপহার সংগ্রহ করতে হবে এই যা।
.........................................................
ছবি- চতুষ্কোণ
পরিচালক- সৃজিত মুখোপাধ্যায়
অভিনয়- চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, বরুণ চন্দ প্রমুখ
সংগীত- অনুপম রায়


আপনার মতামত জানান