খাসি-কসাইয়ের আরব্য রজনীতে বাংলা ছবি

সরোজ দরবার

 

চমক ছিল দুটো। এক, সেলুলয়েডে খাসি মুখে কথা শোনা। দুই, বাংলা ছবিতে বহুদিন পরে নাসিরুদ্দিন শাহের অভিনয়। কিন্তু ছবি একটু এগোতেই বোঝা গেল এগুলোর কোনটাই চমক ছিল না। চমক যদি কিছু থেকে থাকে তবে তা পরিচালক যুধাজিৎ সরকার স্বয়ং।

কী কথা খাসির সনে...

খাসি তো যে সে খাসি নয়। একেবারে প্রোফেসর টাইপ। জন্ম থেকে যে জীবন মৃত্যুর
দিকেই যাচ্ছে এহেন দার্শনিক সত্যি কসাই না জানুক খাসি দিব্যি জানে। বিশ্বায়ন ঢুকে পড়া তৃতীয় বিশ্বের বাজারে তৃতীয় শ্রেনির পশু হয়েও সে ‘গ্লোবালি কানেক্টেড’। নিজেকে আপডেট করে রাখে। আর টিভি ছাড়া তার চলেই না। খাসি খানদানিও বটে। কসাইয়ের(নাসিরুদ্দিন শাহ) পূর্বসূরী যদি হেস্টিংস কিংবা নেহরুর আমলে কসাইগিরি করে থাকে, তবে খাসির পূর্বসূরীরও উত্তমকুমারের বাড়িতে মাটনের ডিস হয়ে গিয়েছিল। তো এই খাসি ঠিক জবাইয়ের আগের রাতে তার কসাইকে গল্প বলতে শুরু করে। ঠিক আরব্য রজনীর স্টাইলে।মজা হল খাসি যে কখন গল্প বলতে শুরু করে কসাইয়ের সঙ্গে দর্শকদেরও খেয়াল থাকে না। কখন যেন আমরা পৌঁছে যাই সালমা(অনিন্দিতা বসু) আর পারভেজের(প্রসূন গায়েন) কাছে। যমজ ভাইবোন। পারভেজ ৩ বছর বক্সিং শিখেও কিস্যু করতে পারে না। গল্প যত এগোয় দেখা যায় প্রসূনের নয়, সালমাই বক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে। পুরো গল্পটাই ‘চার টাংওয়ালা প্রোফেসর’ মার্কা খাসি বলছে তার ‘স্বল্প শিক্ষিত’ কসাইকে। কিন্তু কেন এই গল্প বলা? যে জানে তার ‘জান যাবে’, খানিকটা মিছে সময় নষ্ট করে তার লাভ কি?

সালমা - পারভেজ - প্রহসন

আসলে খাসিদের মতোই সালমাদের জীবনটাও তো প্রহসন। সালমার বাবার চাকরি যায় অপরের কাঠিতে। সালমার দাদা পারভেজ খুব স্বাভাবিক ভাবেই জড়িয়ে পড়বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাজে। এ যেন মাপা চিত্রনাট্যের প্রহসন। কিন্তু তবু সালমার মতো কেউ কেউ থাকে। ধর্মে সংখ্যালঘু, তার উপর মেয়ে...দুই মাইনোরিটির চাপ নিয়েও যে বা যারা বেছে নেবে মার খাওয়ার খেলা বক্সিংকে। খাসিটা যেমন মরে যাওয়ার আগেও জীবনের শেষ চালটাকে আর একবার বাজিয়ে দেখে নেয়, সালমারাও বোধহয় মার খেতে খেতে একবার অন্তত পাল্টা মার দিতে চাইবেই চাইবে। অর্থাৎ প্রহসনের মুখটা ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগটা পরিচালকের হাতেই ছিল পরিচালক তার সদ্বব্যবহার করেছেন।

কন হুঁ ম্যায়
খাসি গল্প শুরু করার আগে এবং গল্প শেষের পরেও কসাইয়ের মনে এ প্রশ্ন জেগে থাকে। প্রশ্নটা কি দর্শকদের দিকেও ছুঁড়ে দেওয়া নয়? খাসিকথা শুনতে শুনতে কসাই বিজ্ঞের মতো কখনও বলে, এটা কেন হবে? ওটা কেন হল? খাসি বিরক্ত হয়। বলে, এত স্বল্পশিক্ষিতদের সঙ্গে কথা বলা যায় না। পরে অবশ্য সেই কসাইকেই সে বলতে বাধ্য হয়, তার মত অডিয়েন্স আছে বলেই দু’একটা ইন্টারেস্টিং গল্প বলার ভরসা পায় সে। আসলে কি আমরাই এই গল্প বলাকে আটকে দিই না? মশালা ছবিকে একশো কোটির বাণিজ্য এনে দিয়ে পপকর্ণ আর কোল্ড ড্রিংক্সের সহযোগে এই দু একটা গল্প বলার ইচ্ছের গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটিয়ে দিই না? খাসি তাহলে কে? আমরাই বা কারা? কসাই ভাবছে, আমরাও বরং ভাবি।

সংলাপ - অভিনয় - অ্যানিমেশন

এককথায় দারুণ। সঙ্গলাপে বিশেষত খাসির বলা কথার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা কখনও হিউমার-স্যাটায়ারের চোখা বাণগুলো কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করার জন্য যথেষ্ট। অভিনয়ের প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয় পরিচালকের অভিনেতাদের ব্যবহারের পরিমিতিবোধেরর কথা। এমনকি নাসিরুদ্দিন শাহের মতো অভিনেতাকে হাতে পেয়েও অতি আহ্লাদের স্ক্রিপ্টকে আটখানা হতে দেননি। তাই চরিত্র অনুযায়ী অনিন্দিতা, প্রসূন, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, বিশ্বজিত চক্রবর্তী, শিলাজিৎ সকলেই ঠিক যেমনটা হওয়া দরকার তেমনটাই। আলাদা করে বলতেই হবে কাঞ্চন মল্লিকের কথা। খাসির কথা তাঁর গলাতেই শোনা গেছে। অ্যানিমেশন-গ্রাফিক্স টিম এ ছবির মেরুদন্ড। অন্তত যে হারে বাংলা ছবিতে বহুব্যয়ে দক্ষিণী ছবির রিমেক হয়ে চলেছে, তাতে স্বল্পব্যয়ের এ ছবির টেকনিক্যাল কাজ সাধুবাদের দাবিদার। সংগীত পরিচালক রাজনারায়ণ দেবের অন্তত দুটো গান বেশ ভালো। কিন্তু আইটেম সং ধরনের আরও দুটি গানের ব্যবহার এ ছবির মেজাজের সঙ্গে ঠিক যায় না বলেই মনে হয়। যেমন অসঙ্গত লাগে বিশ্বনাথ বসুকে দুবার ব্যবহার করা(একবার ট্যাক্সিচালক, আর একবার ভ্যাবলা কিশোরের ভূমিকায়)। বেশ কিছু চরিত্রের আনাগোনা হয়ত না থাকলেও হত।

শেষমেষ
সালমারা জেতে। সালমারা হারেও। ছবিতে সালমার বন্ধু ‘আশা’ মারা যায়। পারকিনসন ডিজিজে আক্রান্ত সালমার বাবা ছেলের অসৎ উপায়ে রোজগারের টাকায় ভাত খেতে ঘেণ্ণা করে, আর ভাবে তার মেয়েটা যদি ছেলে হত, তবে তার হাত ধরে বেরিয়ে যেত। সালমার দাদা জীবনের চোরাগলিতে নিশেষ হয়ে যায়। সরকারের দেওয়া সুবিচার সেই শটে একটুকরো ব্যঙ্গের মতো ঝুলে থাকে সাইনবোর্ডে। আর এই দেওয়ালে পিঠ ঠেকা মুহূর্ত গুলোকে বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে সালমা পালটা পাঞ্চ দেয়। সে জানে না চোট পাওয়া ডান হাতটা তার আর ফিরবে কিনা। জানে না একটা উত্তরণ তাকে কোথায়ই বা পৌঁছে দিতে পারে। আসলে চিত্রনাট্যও তো জানে না জীবন কোথায় যেতে পারে। সে বড়জোড় মারের মুখের উপর দিয়ে জীবনের ফুলটিকে চিনিয়ে দিতে পারে। খাসি কসাইকে জীবন চেনায় বলেই কসাই তাকে জীবনে ফিরতে দেয়। সালমাও জীবনকে চেনে বলেই, তার প্রেমিক গায়ক যখন বিয়ে করতে যায় তার ফুলসাজানো গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ায়। তার কপোলে চুমু খায়। আমরা তো জানি লাইফ ইজ নাঠিং বাট আ ওয়াকিং শ্যাডো। শুধু এই চুমুটাই জেন জীবনের কপালে নজরটিপ হয়ে জেগে থাকে। সেট মিস করবেন কেন। দেখে আসুন অবশ্যই।

পুনশ্চ-
খাসিটি আগাগোড়া বাঙাল ভাষাতেই কথা বলেছে। এখানেও অবদমিতদের একটা ইঙ্গিত, প্রতীকি তাৎ...থাক, মাননীয় নরেন্দ্রবাবুর সেই জনসভার এ সব মিল আর না খুঁজতে যাওয়াই ভালো। দেওয়ালেরও কান আছে, আর দিল্লির নেই? বরং থাক এসব।
(ছবি- খাসি কথা
পরিচালক- জুধাজিৎ সরকার
অভিনয়ে- নাসিরুদ্দিন শাহ,অনিন্দিতা, প্রসূন, শুভাশিস, শিলাজিৎ
সংগীত পরিচালনা-রাজানারায়ণ দেব)

আপনার মতামত জানান