বাড়ি তার বাংলা

ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী

 

প্রথমেই বলে রাখি এই চলচ্চিত্রটি একটি আদ্যোপান্ত মজার বাণিজ্যিক ছবি। তাই যা কিছু ভালো মন্দ নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে বলব, তার মূল মাপকাঠিটা অবশ্যই বাণিজ্যিক। রূপচাঁদ সেন (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়) একজন ৪০ বছর বয়সী ভদ্রলোক, যিনি একটি বিচিত্র সমস্যায় পড়েছেন। তিনি কিছুতেই বাংলা লিখতে পারছেন না; বলে দিলে হয়তো লিখতে পারছেন কিন্তু নিজে ভেবে কিছু বাংলা লিখতে পারছেন না। এক সময়ে যিনি সমস্ত বাংলা কাঁপাতেন তার ছড়া দিয়ে, আজ তার এই করুণ পরিণতি। আর সেই জন্যই তিনি একজন মনোবিদের (রাইমা সেন) দ্বারস্থ। এবং সেখান থেকেই ফ্ল্যাশব্যাকে আসল কাহিনী শুরু। ছোটবেলার থেকে ইংরাজি মিডিয়াম আর বাংলা মিডিয়ামের হাত ঘুরে তিনি একজন অ্যাড গুরুতে পরিণত হন। তার নিজের আপন জন বলতে ছিল তার মা ও বাবা। মায়ের তার ছেলের জন্মগত ছড়া বলার প্রতিভার উপরে উচ্চাশা ছিল অপরিসীম। এবং সেই উচ্চাশার হাত ধরে তিনি তার সন্তানকে প্রথমে ইংরেজি মিডিয়ামে ভর্তি করেন। পরে সেখানে থেকে বিলেতি গালাগাল শিখে ফেলার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করেন। হেরে যাওয়া সামান্য মাইনের চাকরি করা বামপন্থী (যদিও বামপন্থী কথটা কোথাও বলা হয়নি তবু সেটা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না; তবু বামপন্থী হওয়ার সাথে হেরে যাওয়া, উচ্চাশা হীন, ভেতো হবার যে কি সম্পর্ক সেটা বুঝলাম না) বাবার থেকে যাতে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে সে জন্য মায়ের চেষ্টার অন্ত ছিল না।
চলচ্চিত্রটির কতগুলি বিশেষ বার্তা রয়েছে যেগুলো স্বাভাবিক ভাবে আমাদের মন ছুঁয়ে যায়। তার মধ্যে অন্যতম হল মা ও ছেলের মানবিক দিকটি। মাকে কাছে পাওয়ার যে অনুভূতি যা আমাদের মধ্যে মায়ের অবর্তমানে বেঁচে থাকে তা হচ্ছে মাতৃভাষা। এর কোন বিকল্প নেই, যে ভাষাতে আমরা মনের ভাব সবচেয়ে ভালো প্রকাশ করতে পারি তা হচ্ছে মাতৃভাষা, যে ভাষা আমাদের মা শিখিয়ে দিয়েছেন।এই চমৎকার বার্তাটা আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন পরিচালক রঙ্গন চক্রবর্তী। এবং সেটি করেছেন অত্যন্ত মুনশিয়ানার সাথে; এবং ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গীতে। একটি কথা অনস্বীকার্য যে এই বিষয়ের উপরে বাংলা চলচিত্র বোধহয় আগে কখন হয়নি। এর জন্য পরিচালকের অনেক সাধুবাদ প্রাপ্য। অবশ্য সেটা একমাত্র কোন চলচিত্রের গুণমানের মাপকাঠি হতে পারেনা। ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় হাস্যরসগুলো আরও সূক্ষ্ম দাগের হলে এবং কতগুলো দৃশ্য আরও বেশী বাস্তব সম্মত হলে আরও ভালো হত।
এবার একটু চলচ্চিত্রটির গভীরে যাওয়া যাক।প্রথমত আমার ক্যামেরার কাজ এমন কিছু আহামরি মনে হয়নি, বা এমন কিছু মনে হয়নি যা বাহবা দেওয়া যায়। আর গানের কথা যত কম বলা যায় তত ভালো, তবে হ্যাঁ শৌচাগার নির্মাণের উদ্দেশ্যে বাউল সঙ্গীত আর আদিবাসী নৃত্য এক কথায় অসাধারণ। অবশ্য বাকি গান গুলো তথৈবচ। এমনকি নাম দেখানোর সময় প্রথম গানটা দাগ কাটার মতন নয়।তবে নাম দেখানোর সময়ে আঁকা ছবি গুলো সত্যি দারুণ। এবং সেই সঙ্গে আলাদা প্রশংসার দাবি রাখে সেখানে মানুষের সাথে মানুষের ছায়ার ব্যবহারটা। অবশ্য রাইমার সাথে শাশ্বতর প্রেম দৃশ্যে গানটির কোন মাথা মুণ্ডু নেই, অবশ্য এই সব ক্ষেত্রে থাকে না। কেন যে অনেক পরিচালকেরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দিক গুলো, যে গুলো খুব স্বাভাবিক ভাবে আসে সেগুলো ঠিক মতন দেখেন না, তা আজও আমার জানা নেই। ভায়োলিন একটি অত্যন্ত শক্ত বাদ্যযন্ত্র, সেটা হাতে নিয়ে ওরম নাচা যায় তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবেনা। এবং তাই নয় যন্ত্রটি ধরাও ভুল ছিল। এরকম আরও অনেক ব্যাপার আছে, যেমন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ঠিক যেন মনে হচ্ছে একটি বিশাল পাতা যার মধ্যে কোনও লেখা দেখা গেলনা। আরও একটি ব্যাপার, যখন রোগী প্রথম দিন এসে বলল সে লিখতে পারছে না , তার আগে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়ে গেল, এবং পরে একদিন তাকে হাতে পেন তুলে দেওয়া হল লেখার জন্য। এই ব্যাপারটা একেবারেই বিশ্বাস যোগ্য হল না।তবে কয়েকটা ব্যাপারে গবেষণা যথেষ্ট ভালো হয়েছে, যেমন আজ থেকে ৪০ বছর আগে দুধ খাওয়ার বোতল যেরকম দেখতে ছিল সেরকমই রাখা হয়েছে। অথচ আশ্চর্যজনক ভাবে ছোটবেলায় উপহার পাওয়া “স্ট্যাচু অফ লিবার্টির” ক্ষুদ্র সংস্করণ বড়বেলায় একই রকম ঝকঝকে রয়ে গেল। আরও কতগুলো ব্যাপার আছে যেমন মেরুন পার্টির প্রচারের সবকটি বিষয়ে প্রচারের ধরনটা মোটামুটি এক। অনেক অনেক জায়গা ভীষণই অবশ্যম্ভাবী, এবং তাতে কোনও নতুনত্বের ছাপ নেই। ডাক্তার রুগী প্রেমটা এতটাই অবশ্যম্ভাবী, যে আশা করেছিলাম যে এক্ষেত্রে অন্তত পরিচালক একটু নতুন কিছু করবেন। আরও কয়েকটা ব্যাপার ভীষণ ভাবে দৃষ্টিকটু, যেমন একটি বিশেষ ব্র্যান্ডের সোনা প্রস্ততকারক সংস্থার পরোক্ষ বিজ্ঞাপন চলল ছবির মধ্যেই। গয়না রাখা থেকে শুরু করে আলোচনার মধ্যে দিয়ে সেই বিজ্ঞাপনটি বারবার চলে আসছিল। আর সবচেয়ে যেটা হাস্যকর হল বস্তি উচ্ছেদের প্রতিবাদে প্রথমবার সামিল হয়ে কাগজে তাকেই দেখানো হল; এবং সেই কাগজের সেই পাতাটি খুলেই রাইমার হাতে দিয়ে যাওয়া। কখনই এসব ক্ষেত্রে একটি পাতাও কাগজের ওলটাতে হয় না, প্রিয়জনের খবরটি সবসময় প্রথম পাতায় মূল খবর হিসেবে থাকে।আর একটি ব্যাপার বেশ ভালো লাগল যা না বললেই নয় সেই বিখ্যাত চিত্র “The Scream” কে পিছনে রেখে মায়ের ডাক্তারের চেম্বারে আবির্ভাব। মেরুন পার্টি আর হলুদ পার্টির নামকরণ ও তার প্রাসঙ্গিকতা বেশ ভালো হয়েছে। তবে আগেও বলছি হাস্যরসের সৃষ্টির ব্যাপারে এমনি ভালো হলেও একটা স্থূলতা আছে। এই ব্যাপারটায় হয়তো অনেকের ভিন্ন মত হতে পারে তবে আমার মনে হয় এখন হাস্যরসের এতটা দীনতা হয়নি, যে কতগুলো একরকম বিষয় ছাড়া হাস্যরসের সৃষ্টির জায়গা বন্ধ হয়ে গেছে। তবু সব মিলিয়ে বলতে গেলে ‘বাড়ি তার বাংলা’ ভালো বার্তা বহন কারী একটি মজাদার চলচ্চিত্র।
এবার আসি অভিনয়ের প্রসঙ্গে, যথারীতি শাশ্বত ও রাইমা এক কথায় অনবদ্য। শাশ্বত সম্বন্ধে নতুন কিছু বলার নেই, এত সাবলীল অভিনেতা এই মুহূর্তে খুব কমই আছে। আর রাইমা যথারীতি একজন অত্যন্ত পরিণত অভিনেত্রী। এদের দুজনের জন্য আলাদা করে কোন প্রশংসাই সম্পূর্ণ নয়। তুলিকা বাসু, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, সবাই তাদের নিজ নিজ চরিত্রে অনবদ্য। এককথায়, আমরা পরিচালক রঙ্গন চক্রবর্তীর কাছ থেকে একটি মজাদার বাণিজ্যিক ছবি উপহার পেলাম।

আপনার মতামত জানান