লারস ভন ট্রায়ারের ‘নিম্ফোম্যানিয়াক’ দেখলাম

অনুপম মুখোপাধ্যায়

 

এভাবেই জল খসে, এভাবেই মাল।
কেউ মারে উঁকিঝুঁকি, কেউ পাড়ে গাল।।


লারস ভন ট্রায়ার আবার একটা সিনেমা বানাচ্ছেন, তার নাম ‘নিম্ফোম্যানিয়াক’, এটা জানার পর থেকে অধীর ছিলাম। তারপর জানলাম সেটা দুটো পার্টে বেরিয়েছে। অহেতুক মনে হয়েছিল, তবে কি এটা কোয়ান্টিন টারান্টিনোর ‘কিল বিল ১+২’-এর জবাব বা প্রভাব? দুটো পার্টে নায়িকা কেন্দ্রিক ছবি হলেই সেটা হয় না, তবু মনে হয়েছিল। এভাবেই তো হয়। এভাবেই ‘থ্রিলারঃ আ ক্রুয়েল পিকচার’ নামক প্রায় থ্রি এক্স অধুনা বিস্মৃতপ্রায় এডাল্ট ছবিটি ( সেখানে সরাসরি যোনিতে লিঙ্গ প্রবেশের এবং নায়িকার যন্ত্রনাদায়ক পায়ুমৈথুনের দৃশ্য ছিল) থেকে এবং ‘আই স্পিট অন ইওর গ্রেভ’ নামক আরেকটি কুখ্যাত রগরগে ব্যানড ছবি থেকে ‘কিল বিল’-এর মতো একটি একশন এপিক জন্ম নিয়েছিল। সেই সঙ্গে তাতে ব্রুস লি অভিনীত ক্ল্যাসিক ‘এন্টার দ্য ড্র্যাগন’-এর এবং ‘বিগ বস’-এর ঋণও ছিল।
অনেক খোঁজার পরে, ব্যর্থ অনেকগুলো চেষ্টার পরে যখন সত্যিই ‘নিম্ফোম্যানিয়াক’-এর সঠিক টরেন্ট পেলাম, এবং রাত জেগে দেখলাম, আমার মনে হল ছবিটি না দেখেই যে অনুমান করেছিলাম তা অমূলক নয়। এই ছবি ‘কিল বিল’-এর আত্মীয়। শুধু এখানে হিংসার বদলে কামকে উদযাপন করা হয়েছে। এবং, এখানেও ‘এন্টিক্রাইস্ট’-এর বা ‘মেলাংকোলিয়া’-র অনেক উপাদান থাকলেও এখানে পরিচালক ঢের বেশি তিক্ত ও ইয়ার্কিপ্রবণ। বিষাদকে তো ইয়ার্কিতেই ওড়াতে হয়, তাই না?
যারা কামপ্রবণতাকে দরজার আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন এই ছবি তাঁদের সহ্য হবে না। যারা কামের সঙ্গে আনন্দকে গুলিয়ে ফেলেন... ধরুন ‘জয় অব সেক্স’... তাঁদের জন্যও এই ছবি নয়। এই সিনেমাকে আপনি সেক্সের প্যারাডাইস ভেবে ঢুকলে ঠকে যাবেন, এ আসলে সেক্সের প্যারডি। ১৯৭০-এর দশকে মেয়েদের কাম নিয়ে যেসব ফিল্ম বাজারে এসেছিল, এই সিনেমা তাদের ব্যবহার করেছে, আসলে তাদের ব্যঙ্গ করেছে। ‘দ্য স্টোরি অব ও’-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার কোনো কারণ নেই, কারণ এখানে ফ্যান্টাসি ব্যাপারটাকে নিংড়ে তার সব মায়াজাল শেষ করে দেওয়া হয়েছে। বুনুয়েলের ‘বেলে ডি জুর’-এর সঙ্গেও না, কারণ এখানে আপনি বিকটকে পাবেন, উদ্ভটকে না। অগোছালো একটি সিনেমা, যাকে গুছিয়ে তোলাটা জীবনকে গুছিয়ে তোলার মতোই অসম্ভব। জীবনের চ্যাপ্টারগুলো আসলে এই সিনেমার মতোই।
মেয়েদের কি অর্গ্যাজম হয়? এই প্রশ্ন নাকি উত্তরহীন! ভাবা যায়! মেয়েদের সেক্সের পরে যদি জল না খসত, তাদের যে শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হত, তাদের আর বাঁচতে হত না। তলপেটের ব্যথাতেই মরে যেত। কিন্তু পুরুষতন্ত্র সেটাও ভাবতে পেরেছে। মেয়েদের অর্গ্যাজম হয় কি হয় না এই নিয়ে কল্পনার শেষ নেই।
এই সিনেমা পুরুষতন্ত্রের গালে থাপ্পড় মারে।
একটি মেয়ে এখানে ডন জুয়ানের ভূমিকায় অবতীর্ণ। সে সেক্সের রাজ্যে এক প্রমীলা দন কিহোতেও বটে।
বলা বাহুল্য, এই ছবি ইরোটিকা নয়। এই ছবি ইরোটিকার ধারণাটাকেই আক্রমণ করেছে। নায়িকা ভাবলেশহীনভাবে একজন পুরুষকে ( শেষ পর্যন্ত দর্শক ভাবে পুরুষটির কোনো যৌন আগ্রহ নেই। সে ক্লিনিকালভাবে ঘটনাগুলো শুনছে। কিন্তু সেটা নয়। যে কোনো পুরুষের মতোই সে তার লিঙ্গটিকে একটি গর্তের মধ্যে চায়। শেষে মরে। ) নিজের চরম অসামাজিক কিন্তু অনিবার্য যৌণ অভিজ্ঞতাগুলো বলে চলে। নিজের বহুগামীতা তার স্বভাব। স্বভাবে কোনো মলিনতা নেই। একটা সময় খুব একঘেয়ে লাগে ঘটনাগুলো। এই একঘেয়েমি পরিচালকের ইচ্ছাকৃত। অতিরিক্ত যা কিছু আছে, তাও ইচ্ছাকৃত।
একটি দৃশ্যে নায়িকা দুজন কৃষ্ণাঙ্গ জিগোলোকে ডাকে। তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করে সেক্স পোজিসন নিয়ে। একজনকে পায়ু নিতে হবে, আরেকজনকে যোনি। কে কোনটা নেবে এবং কীভাবে কাজটা হবে সেই নিয়ে তাদের আলোচনা শুরু হয়। দুটি শাবলের মতো উত্থিত লিঙ্গের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে নগ্ন হতাশ অধৈর্য নায়িকা। লিঙ্গদুটি দোল খাচ্ছে তার দুপাশে খাদ্যবস্তুর মতো। কিন্তু তার খিদে হারিয়ে যাচ্ছে।
অন্যত্র, সে এক পেশাদার পুরুষের হাতে নিজের নগ্ন নিতম্বে চাবুক খায়, কিন্তু যখন উন্মুখ হয়ে তার লিঙ্গটি নিজের যোনিতে নিতে চায়... I want your cock! ...পুরুষটি তার পেশাকে অপমানিত ভাবে। তার কাজ চাবুক মারা, সবচেয়ে নিপুনভাবে যন্ত্রনা দেওয়া। সেখানে তার লিঙ্গের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে কি?
এই হল পুরুষ!
সরি!
এই হলাম আমরা। আমরা ভাবি আনন্দ। মেয়েরা কী ভাবেন বলুন তো? কোনোদিন কোনো পুরুষ জানতে পেরেছে, সঙ্গমের সময়ে বা পরে একটি মেয়ের শরীরে ও মনে ঠিক কী ঘটে?
না জেনেই চিত্তির।
চাবুকে চাবুকে ক্ষতবিক্ষত ও তৃপ্ত একটি নিতম্ব... রক্তের দাগগুলোর পাশে কী করুণই না লাগে একটি পায়ুছিদ্রকে!

আপনার মতামত জানান