ক্যহেকে লুঙ্গা

সুপ্রভাত রায়

 

আমাদের সেই ছোট্ট সাদাকালো টিভিটায় ‘ডিডিওয়ানে’ রাত্রে যখন হিন্দি ছবি দিত, তখন সকাল থেকে বাবুই পাখির মতো আগ্রহ জড়ো করতাম ঠোঁটে ঠোঁটে নিজস্ব বাসা বানাবো বলে। নামটা জেনে নিয়েই বাবার কাছে একটাই প্রশ্ন থাকত, একটাই জানতে চাওয়ার বিষয়; মারামারি আছে ? নায়ক আর ভিলেনের নাম দেখে উৎসাহের গোঁড়ায় জল দিতাম দিনভর। আমজাদ খান আর অমরিশ পুরি থাকলে ওরা এমন কিছু বদমাইসি করবেই যে মারামারি থাকবেই, তা সে যত শান্ত নায়কই থাকুক না কেন। নায়কের নাম রাজেশ খান্না, বিনোদ মেহেরা এই রকম কিছু হলে চুপশে যেত দিন ফুটো হয়ে যেত ব্যর্থ রাত। আর যদি আর যদি বচ্চন থাকে; তবে সকাল থেকে নিজেরই প্র্যাকটিস শুরু হয়ে যেত মারামারির, মুখে কাল্পনিক আঘাতের শব্দ করতে করতে। সেই গল্পের ছবি ঝিল ঝিল হয়ে গেছে কবে। অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে ঘুরিয়েও আর ভাল ছবি আসে না তেমন। কৈশোরের ধূধূ মাঠে হাওয়ায় হাওয়ায় প্রশ্ন ওড়ে মারামারি আছে? মারামারি আছে? মারামারি আছে ? এখন বুঝি প্রতিশোধ প্রবণতার মুখে ঠেসেঠুসে বারুদ ভরতে, এই ভারতে কেমন করে শেখাচ্ছিল হিন্দি ছবি। রামাধির সিং এর ডায়লগ মনে পড়ে গেল—ইস দেশ মে যব তক সিনেমা রহেগা সব শালে চুতিয়া হি বনেগা।

সে এক দীর্ঘ প্রতিশোধের আখ্যান। স্বাধীনতার পূর্বে শুরু হয়ে শেষ হয় দু’হাজার নয় সালে। মুম্বই এ ফয়জল খানের সন্তান মায়ের কোলে নতুন একটা সকাল দেখছে। গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর এর পার্ট ওয়ান পার্ট টু জুড়ে জেনারেশনের পর জেনারেশন র্যাাশন নেওয়ার লাইনের মতো দাঁড়িয়ে পর্দায়, নায়ক হতে চেয়ে। শাহিদ খান। অন্য ডাকাতের নাম ভাঙিয়ে ট্রেন ডাকাতি করে । এই ভাবেই শুরু হয়ে যায় কাহিনি, বেঁচে থাকার লড়াই জাপটে ধরে বাঁচে সবার উপর রাজ্‌ কর তে চাওয়া চরিত্ররা। খুন হয়ে যায়। একের পর এক। গ্রাম থেকে বিতাড়িত শাহিদ খান চাকরি পায় কয়লা খনিতে। শ্রমিক। যেখানে মৃত্যুই একমাত্র কারণ হতে পারে কাজ থেমে যাওয়ার। রামাধির সিং, যার আন্ডারে এই কয়লা খনি। রামাধির সিং-- এই সেই চরিত্র; যার ব্রেণ তাকে টিকিয়ে রাখে পার্ট ওয়ান পার্ট টু এর শেষের একটু আগে অবধি। মেনে নিতে পারে না সে কয়লা খনিতে তারই বডিগার্ডের স্বপ্ন। কাটা ঘায়ে খুনের ছিটে এসে লাগে। শাহিদ খান খুন হয়ে যায়। একটা ছাতা পড়ে থাকে খুনিকে চিনিয়ে দেবার সমস্ত অকাল বর্ষন নিয়ে।

ইতিহাস উঠে আসে খুব। শ্রেণী বিন্যাস চলতে থাকে। তো এখন কথা হল আপাতত ভারতবর্ষের হিন্দি ছবির দর্শকও দুটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত। এক যারা গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর এক দুই দেখেছে, আরা বাকি পড়ে থাকল যারা দেখেনি।

সর্দার খান নাম হ্যা মেরা, নাম ইয়াদ রাখনা—আম্মি অগর মেরে পাশ মাচিস হোতা তো দুনিয়াকো জ্বালা নেহি দেতা ক্যায়া—সব কা বদলা লেগা তেরা ফয়জল বাপকা দাদাকা ভাইকা—ডায়লগ ডায়লগ ডায়লগ...একবার এই ডায়লগের ভিতর লগ ইন করলে আর বেরোনোর কোনো উপায় নেই। ডু অর ডাই সব্বার হিরো হওয়া চাই।
ভারতের হিন্দি ছবির লিষ্টে এ সেই ছবি যেখানে সব চরিত্র ক্যারেক্টার হয়ে ওঠে। চাপ চাপ প্রতিশোধের ভিতর থেকে টাকা আর রক্তের গন্ধ এক সাথে পাওয়া যায়। গুলির শব্দে গুলিয়ে যায় গা। কাহিনি এগিয়ে যায়। একটার পর একটা মৃত্যুর সুতো ধরে ধরে।

তিনি অনুরাগ কশ্যপ। এক্কেবারে দুই খণ্ডে একটা গোটা ছবি বানিয়ে আমাদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। যে দেশে একমাত্র কোনো ছবির বক্স অফিস সাফল্যই পার্ট টু’র দিকে এগিয়ে দেয়। কিন্তু তিনি অনুরাগ কশ্যপ, একটা গল্প বলতে চেয়েছেন ভয়ংকর সুন্দর সত্যির চাদর জড়ানো একটা গল্প। বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে করে এই আমার দেশ, অথচ বিশ্বাস করতে ভয় করে এই আমার দেশ ?

অথচ প্রত্যেকটা চরিত্রের মধ্যে অদ্ভুত এক পারিবারিক মূল্যবোধ। কিন্তু সেই বোধের এত হাইফাই মূল্য যে সব্বাই নিজেকে লার্জার দ্যান লাইফ ভাবে। শুধু টিকে থেকে থেকে থেকে ফিকে হয়ে যেতে চাই না কেউ। এই ছবি বানাতে শুধু মেধা না, ধকেরও ধামাকা লাগে। অনুরাগ কশ্যপে মুগ্ধতা তো সেই কবেই শুরু হয়ে গেছিল, গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরে এসে যেন তিনি একটা দীর্ঘ ম্যাচ উইনিং ইনিংস খেলে আকাশের দিকে ব্যাটটা একটু আলতো করে তুললেন। আমরা হাততালি হাততালিতে ফেটে পড়লাম গুলির মতো।

শাহিদখান সর্দারখান দানিশ ফয়জলখান সুলতান রামাধিরসিং কুরেশি পারপেণ্টিকুলার ডেফিনেট নাসির আরো আরো আরো সব চরিত্ররা নিজেই নিজের কেন্দ্রে ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে জন্ম দেয় এক রোখা আকর্ষনের। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আবহাওয়া। ভর্তি বাজারে আচমকা নেমে যায় সাহসের শাটার। দৃঢ় দুই গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে দুই মা। দুই নারীচরিত্র। ডালপালায় সন্তান স্নেহ নিয়ে। নাগমা আর দুর্গা। সর্দার খানের দুই সম্পর্ক। আর এই আগুন-অপরাধ-নেশা-খুন এর হাওয়াতেও টুপটাপ প্রেম ফোটে। প্রেমিকার হাত ধরার খিদে চেগে ওঠে ফয়জলের মনে, সে ‘পারমিশন’ নিতে ভুলে যায়। বকা খায়। মহসিনা তার প্রেমিকা তাকে শেখায় ‘পারমিশন তো লেনা চাহিয়ে’।

সকলই ফুরায় ...সকলেই ক্ষমতা হারায়। ঝকঝকে গিফট্‌ প্যাকেটে মোড়া সকাল নিয়ে আগামীর কোনো প্রত্যাশা লেগে থাকে আলোয়। শন্‌ শন্‌ হাওয়া দেয় প্রতিশোধ স্পৃহার পাতায় পাতায়। সময়ের কাঁধে চেপে শবদেহ পৌঁছে যায় গন্তব্যে । মরে যাওয়া একটা ক্যারেক্টারও যেন বলে ওঠে আমার গন্তব্যে তুই আগে থেকে কে বে ?

আপনার মতামত জানান