ভিন্নমত - রিভিউ- চতুষ্কোণ - কিছু কখা

জনৈক চলচ্চিত্র প্রেমী

 

(কিছু কথা- সাধারনত একটা ওয়েবসাইটে একই সিনেমার দুটি রিভিউ প্রকাশিত হয় না, কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে চতুষ্কোণ নিয়ে একজন সমালোচক ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন সেটিও সবার সামনে তুলে ধরা উচিত। তাই এই প্রকাশ। )



প্রথমেই জানিয়ে রাখি আমি পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের একজন গুণগ্রাহী দর্শক। তাই আশা রাখলাম যে পাঠক এই প্রতিবেদনের মধ্যে কোনপ্রকার বৈরিতার গন্ধ খুঁজতে যাবেন না। অন্য সবার মতন চতুষ্কোণ মুক্তির দিন গুনছিলাম আমিও কারন এই ছবির কলাকুশলীরা প্রত্যেকেই প্রথিতযশা। অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ, চিরঞ্জীত চক্রবর্তী, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, স্বনামধন্য চিত্রগ্রাহক সুদীপ চট্টোপাধ্যায় এবং সর্বপরি পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের পারস্পরিক রসায়নটা ঠিক কেমন জমেছে, সেটা সিনেমার বড় পর্দায় প্রতফলিত হতে দেখার আগ্রহ সবার মতন আমারও ছিল। তাই প্রথম সুযোগেই নন্দনে ঢুকে পড়েছিলাম চতুষ্কোণ দেখতে। তার আগের দিন রাত্রে অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে ফেলেছিলাম যে বাংলা সিনেমার সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু বিদগ্ধ মানুষ ‘চতুষ্কোণ’ –কে সৃজিত মুখোপাধ্যয়ের এখনো পর্যন্ত ‘সেরা’ ছবির মর্যাদা দিয়ে ফেলেছেন। আমারও প্রত্যাশা তাই হয়ে উঠেছিলো গগনচুম্বী।
ছবিটা বেশ মন দিয়ে দেখলাম ... আগেও লিখেছি যে আমি সৃজিতের একজন গুনমুগ্ধ দর্শক তাই সবার মতের সঙ্গে আমার মত না মিললেও আশা রাখলাম আমাকে ‘নিন্দুক’ প্রতিপন্ন করা হবেনা। না বন্ধুরা, চতুষ্কোণ ‘ভাল’ ছবি, বেশ মৌলিক ভাবনার প্রতিফলন কিন্তু আমি একে কোনভাবেই সৃজিতের ‘সেরা’ ছবির শিরোপা দিতে রাজি নই। আমার মতে সৃজিতের সেরা ছবির দাবিদার হতে পারে ‘জাতিস্মর’, যদি মেকিং প্রাধান্য পায় ... গল্পের অভিনবত্বে খুব কাছাকাছি হয়ত আসতে পারে ‘বাইশে শ্রাবণ’ ... এই দুটি ছবির মধ্যে তফাত হবে উনিশ বিশ। যদিও আমার কাছে ‘অটোগ্রাফ’ এখনো খুব স্পেশাল ... প্রথম ছবি বলে হয়ত নিজেও একটু বেশি যত্নবান ছিলেন সৃজিত। যে যাই ভাবুক ... চতুষ্কোণ – কে আমি সৃজিতের সেরার শিরোপা দিতে নারাজ। কেন? সেই আলোচনা করার জন্যেই এই প্রতিবেদন লিখতে বসা ......
প্রথম ৮০ মিনিট ছবির গতি ভীষণরকম মন্থর। প্রায় শম্বুকের মতন এগোয় ছবির গল্প। ৫ মিনিটের সিগারেট ব্রেক নিলেও ফিরে এসে ছবির গতির সঙ্গে তাল মেলানো যায়। থ্রিলারে এমন হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু মজাটা হচ্ছে ছবির প্রথমাংশ দেখে কেউ বুঝতেই পারবেন না যে ‘চতুষ্কোণ’ আসলে একটি সাসপেন্স থ্রিলার। তিন পরিচালকের তিনটি স্বল্পদৈর্ঘের ছবি এখানে দেখানো হয়েছে কিন্তু সেগুলির মধ্যে দুটি-ই বেশ সাধারন মানের। সৃজিতের চরিত্রগুলির ব্যক্তিত্ত্ব সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গল্পগুলির জাল বোনা উচিৎ ছিল। যে ছোট ছবিগুলির ঢেউ এসে শেষ পর্যন্ত বড় ছবিটির উপসংহারের সমুদ্রে মিশে যাবে। কিন্তু সৃজিত সেই পথে না হেটে এমন তিনটি গল্প ভাবলেন ... যেগুলি ঠিক সৃজিত সুলভ নয়। যেমন শাক্য চরিত্রটি একজন সিরিয়াস ফিল্ম মেকারের এবং সৃজিত এই চরিত্রে অভিনয় করার জন্যে বেছে নিয়েছেন ‘মাভূমি’, ‘পার’ কিম্বা ‘দেখা’-র মতন আর্ট ফিল্মের নির্দেশক গৌতম ঘোষ-কে । তাহলে দর্শক হিসাবে আমার মনেও আশা জাগতেই পারে যে শাক্য-র ভাবা ‘ছোট’ ছবিটি ‘গৌতম ঘোষ’ সুলভ হবে কারণ পর্দার শাক্য-কে সৃজিত বাস্তবের গৌতম দার সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করেছেন। কিন্তু না, আমার সে আশা অচিরেই ভঙ্গ হল যখন শাক্য-র মুখ দিয়ে একটা ‘অনাথবাবুর ভয়’ অথবা ‘মিঃ শাসমলের শেষ রাত্রির’ মতন ভূতের ছোট গল্প বলানো হল। জমলো না সৃজিত ... একেবারেই জমলো না! আর তাতে যা হল, সেটাকে বলা যেতে পারে ... শুরুতেই ছন্দপতন !!! এরপরে এল দীপ্ত অর্থাৎ চিরঞ্জীত-এর গল্প, যেটার মূল বক্তব্য হল একজন একাকী মানুষের কোন এক বিশেষ বস্তুর প্রতি মানসিক দুর্বলতা, এই ক্ষেত্রে সেটি সিগারেট। থিম বেশ অন্যরকম, ট্রিটমেন্ট মন্দ না, ক্যামেরার কাজ অসাধারন। কিছুটা হলেও চেনা সৃজিত-কে খুঁজে পাওয়া গেল। কিন্তু তৃনা (অপর্ণা সেন) –এর গল্পে এসে আবার যে কে সেই! প্ল্যানচেট নিয়ে জগাখিচুড়ী একটা ‘সাধারন’ গল্প বলানো হল তৃনা-র মুখ দিয়ে, যা মনে কোনরকম দাগ কাটে না। আসলে আমার মনে হয়েছে তিনজনের গল্পই যদি ছবির মূল ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লিখতেন সৃজিত, তাহলে সিনেমার মজাটাই অন্যরকম হলেও হতে পারতো।
রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্রাশিস রায় এবং পায়েল সরকার-এর ত্রিকোণ প্রেম তথা অপ্রেমের অংশগুলির অভ্যন্তরে অন্তর্নিহিত সাব- প্লট –টি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। রাহুল অনবদ্য অভিনয় করেছেন। ইন্দ্রাশিস মোটামুটি উতরে দিয়েছেন কিন্তু পায়েল ভীষণ খারাপ অভিনয় করেছেন। আমি তো ভাবতেই পারিনা যে পায়েল কোনোদিন অপর্ণা সেন-এর ব্যক্তিত্বের ধারেকাছেও পৌঁছোতে পারবেন কিম্বা তিনি তা করার চেষ্টাও করবেন বলে। আসলে এখানে তৃনা চরিত্রটি সেভাবে দানা বাঁধেনি। তার নায়িকা থেকে পরিচালিকা হওয়ার পদ্ধতি কিম্বা পথ টা সৃজিত আমাদের দেখানোর চেষ্টা করেননি। তাই অপর্ণা সেন কে পর্দায় দেখে একজন পরিচালিকা হিসাবে মেনে নিতে সমস্যা না হলেও, চতুষ্কোণের তৃনা-কে একজন সফল পরিচালিকা রূপে মেনে নিতে আমার মতন অনেকেরই সমস্যা হয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবের অপর্ণা সেন এবং চিত্রনাট্যের তৃনার ব্যক্তিত্বের সংঘাত ঘটেছে চতুষ্কোণের নানান বাঁকে। সিনেমায় ‘সময়’ নিয়ে খেলা করাটা খুব ইন্টারেস্টিং কিন্তু এখানে সেটা করতে গিয়ে চিত্রনাট্য মাঝে মধ্যেই পথ হারিয়েছে। প্রথমেই একটা আত্মহত্যা দেখানো হল তারপরই জয়ব্রত (পরমব্রত) –কে সিনেমায় ইন্ট্রোডিউস করা হল, তখনই অর্ধেক থ্রিলার দেখিয়ে দর্শক বুঝতে পেরে গেছিলো যে জয়ব্রতর সঙ্গে এই আত্মহত্যার কিছু না কিছু সংযোগ আছে। তারপর বিশ্বজিত চক্রবর্তীর মতন একজন অভিনেতাকে দিয়ে অহেতুক রহস্যজনক সাজার নাটক করানোটাও বেশ হাস্যকর। থ্রিলার কী ওইভাবে হয় নাকি? না ... বাইশে শ্রাবণের লেখক-পরিচালকের কাছ থেকে এমন কাঁচা কাজ আমি আশা করিনি।
হ্যাঁ !!! ... শেষ ৪০ মিনিট আমি সৃজিত-কে খুঁজে পেয়েছি। ঐ যাকে বলে ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’ !!! পরমের ফাটাফাটি অভিনয় ছবির ক্লাইম্যাক্স-কে জমজমাট করে তুলেছে। ঋতুপর্ণ ঘোষ আজ আমাদের মধ্যে থাকলে এবং এই চরিত্রটিতে অভিনয় করলে ... কেমন হত আমি জানিনা কিন্তু পরম যেভাবে করেছেন তাতে দর্শক হিসাবে আমার নালিশ নেই। তবে পরমকে কেন যে অমন একটা ‘ভুঁড়ি’ বানিয়ে দেওয়া হোল এবং দুই পা ফাঁক করে অমন আনস্মার্ট ভাবে হাঁটানো হোল, কারনটি আমি বুঝতে পারলাম না ... পরম যদি হেমলক সোসাইটির মতন করে স্মার্টলী ক্লাইম্যাক্স টা-কে হ্যান্ডেল করতেন, তাতে কি এমন এক ক্লাইম্যাক্সের জোর কমে যেত? এই প্রশ্নটা আমার মনে রয়েই গেলো। বিশেষত সৃজিত যখন জয়ব্রত-কে একজন সফল অভিনেতা রূপে দেখিয়েছেন।
শাক্য চরিত্রে গৌতম ঘোষ এমন কিছু স্পেশাল অভিনয়ের সাক্ষর রাখতে পারেননি কারন সৃজিত ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর নিবারণ চক্রবর্তীর-র মতন গৌতম দা-কে বিশাল খেলার ময়দান দেননি। পরমের কথা আগেই লিখে ফেলেছি ... হারকিঊলীস এবং এবার চতুষ্কোণ ... অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় নিজেকে নিয়ে খুব খাটছেন এবং সেটি তার প্রত্যেকটি কাজে প্রতিফলিত হচ্ছে। আবির চট্টোপাধ্যয়ের উত্তরণ পরমের পক্ষে শাপে বর স্বরূপ প্রতিপন্ন্য হচ্ছে, তিনি নিজের প্রতিভার প্রতি এখন সুবিচার করতে শুরু করেছেন। তৃনা চরিত্রে অপর্ণা সেন জাস্ট কাজটি করে দিয়েছেন, তার নিজের খুব একটা বেশি হোমওয়ার্ক ছিল বলে আমার মনে হয়নি। সৃজিত যদি সত্যি সত্যি তৃনা-র শর্ট ফিল্মের স্ক্রিপ্টটা অপর্ণা সেন –কে দিয়ে লেখাতেন এবং শাক্য-র ছবিটা গৌতম দা কে দিয়ে লেখাতেন তাহলে হয়ত আমরা কিছুটা হলেও রীনাদি তথা গৌতমদার লেখনী প্রতিভার বিচ্ছুরণ সৃজিতের কাজে খুঁজে পেতাম। বাংলা ছবিতে ইতিহাস সৃষ্টি করার মোড়ে দাড়িয়েও সৃজিত সেই পথ বেছে নিলেন না ... কেন নিলেন না ? আমি জানিনা ... বন্ধু হলে হয়ত জিজ্ঞেস করতাম তাকে।
এই ছবির সেরা প্রাপ্তি অভিনেতা চিরঞ্জীত চক্রবর্তী অভিনীত ‘দীপ্ত’। দীপ্তর দৃপ্ত স্ক্রিন প্রেজেন্স-কে বলা চলে এই ছবির লাইফলাইন। সবাই এক বাক্যে স্বীকার করছে যে টলিউড এমন এক মধ্য বয়স্ক নায়ক্-কে ভীষণ মিস করছিলো। বুম্বা দা (প্রসেঞ্জিত চট্টোপাধ্যায়) এবং বেণু দা (সব্যসাচী চক্রবর্তী) র উপর একটু বেশি-ই চাপ পড়ে যাচ্ছিলো। এবার বাংলা ছবির পরিচালক রা তাদের ছবির মধ্য বয়স্ক নায়কের চরিত্রে দীপকদা-কে ভাবতেই পারেন। দীপ্ত-র গুরুত্বপূর্ণ তথা শক্ত চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন একদা বাংলা বানিজ্যিক ছবির এই দাপুটে সুদর্শন নায়ক। সৃজিত-কে ধন্যবাদ চিরঞ্জীত চক্রবর্তী-কে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে। আরেকজনের কথা এখানে লিখতেই হবে, তিনি কৌশিক গাঙ্গুলি। অসাধারণ অভিনয় করেছেন এই পরিচালক। একটি দৃশ্যেই দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে দিয়েছেন। কৌশিক দার কথা মাথায় রেখে এমন এক চরিত্র সৃষ্টির জন্যে সৃজিতের সাধুবাদ পাওয়া উচিৎ। কৌশিক দার অভিনয় দেখার পরে একটা কথাই মনে হচ্ছিলো ... \"শেষ হয়েও হইলো না শেষ। \"

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়-এর ক্যামেরা এই ছবিতে কথা বলেছে ... এক একটি ফ্রেম মনের মধ্যে জায়গা করে নেয়। সৃজিতকে আবারও সাধুবাদ জানাবো এমন এক প্রতিভাধর বাঙালি চিত্রগ্রাহক-কে মুম্বই থেকে বাংলা ছবিতে নিয়ে আসার জন্যে। রবিরঞ্জন মৈত্রের সম্পাদনা আরও অনেক টানটান হতে পারতো ... ছবিটাও ১০/১৫ মিনিট ছোট হতেই পারতো বলা আমার বিশ্বাস। অনুপম রায়ের গান শুনতে বেশ লাগে কিন্তু প্রথম গানটি (বসন্ত এসে গেছে) ছবিটিকে স্লথ করেছে ... অ্যালবাম-এ থাকুক কিন্তু ছবিতে অত বড় গান না রাখলেই ভাল হত। গানটি শুনতে বেশ লাগে এবং নবাগতা গায়িকা লগ্নজীতা গেয়েছেনও বেশ কিন্তু ছবির স্বার্থ সবার আগে আসে, তাইনা সৃজিত? হেমলক সোসাইটিতে লোপামুদ্রা মিত্র-এর অমন ভাল গানটিকে আপনি এন্ড ক্রেডিট টাইটেল কার্ড দেওয়ার সময় ব্যবহার করেছিলেন আর রূপঙ্কর-এর ভার্সন টাকে ছবিতে রাখেন-ই নি। মনে পড়ে?
অনেক লিখে ফেললাম ... সৃজিত আমার কাছে এই ছবি আপনার সেরা নয় ... অন্যতম সেরা-ও নয়! এটি একটি ভাল ছবি... মৌলিক ছবি ... দেখার মতন ছবি ... তবে আপনার সেরা কীর্তি কোনভাবেই বলবনা। নম্বর দেব? হুম ... জাস্ট ফার্স্ট ক্লাস পাবেন ... ৬/১০।

আপনার মতামত জানান