কেতনের রংমহল

সরোজ দরবার

 


‘লংগেস্ট প্রেগনেন্সি’।
আপকামিং ছবি ‘রঙ রসিয়া’র জন্য এই শব্দ দুটিই ব্যবহার করলেন পরিচালক কেতন মেহতা। আট বছর সময়টা তো কম নয়। যে বলিউড কালারফুল লাইফের সেলিব্রেট করে, সেখানেই কিনা এক রঙের মানুষের জীবনের উপর ছবি এতগুলো বছর মুক্তির অপেক্ষায় আটকে ছিল। ছবির স্পেশাল স্ক্রিনিং শুরুর আগে নন্দনা সেন দর্শককে (আসনে তখন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষের মতো পরিচালক) ‘খোলা মনে’ ছবিটা দেখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তাঁর নিজের শহর ছবিটার প্রতিক্রিয়া কী হবে, হ্য়তো তাই নিয়েই ছিল সংশয় ছিল। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বছর দুই-তিন আগে ছবিটি দেখানো হলেও, চলচ্চিত্র উৎসবের পরিমন্ডল স্বভাবতই আলাদা। এমনিতেই ন্যুডিটি, সেন্সরশিপ ইত্যাদি নিয়ে বিতর্কে ছবি জেরবার। সেটাই বোধহয় ছবিটার ট্র্যাজেডি। যা নিয়ে বিতর্কের বাজার গরম হয় ছবির রাজনীতি কিন্তু সে সব থেকে অনেক দূরে। ছবি শুরু হতেই সেটা টের পেলেন দর্শক ।
রভি রাজা বর্মাকে শুধু ১৯ শতকের একজন চিত্রশিল্পী না বলে, বিপ্লবী বলা ভালো। তাঁর জীবন আধারিত ছবির টেক্সট হিসেবে কেতন বেছে নিয়েছিলেন রঞ্জিত দেশাইয়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘রভি রাজা বর্মা’। ছবিতে পরতে পরতে যখন তাঁর জীবনকাহিনি খুলছে, আসলে যেন খুলে যাচ্ছিল একটা সময়ের দলিল। যেখানে একদিকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির জন্য জন্মগত স্বরাজের অধিকারের দাবী জানাচ্ছে জাতীয় কংগ্রেস। অন্যদিকে গোঁড়ামি- সংকীর্ণতা- ধর্ম ব্যবসা- নগ্নতার ট্যাবু ভেঙে শিল্পীর জন্মগত স্বরাজকে নিজের জীবন দিয়ে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন একজন শিল্পী। দুইই প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা সংগ্রাম। দুইই আত্মবলিদানের ইতিহাস।
নবজাগরণের আলো যখন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের রীতিকে স্বচ্ছ চিন্তার প্রিজমের মধ্যে দিয়ে এক রশ্মিতে প্রতিফলিত করছে, রভি বর্মার চিত্রকলাতেও পড়েছে সেই আলো। মানুষটার বৈপ্লবিক চিন্তাধারা শুধু সেই আলোটুকু সম্বল করেই সন্তুষ্ট হয়নি। বিজ্ঞান আর ধর্মের অক্ষরেখায় শিল্পের অবস্থান নির্ণয়ের গণিতই তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সামাজিক প্রশ্নমালার সামনে। বিদ্যুতের আলোয় পুরূরবা যখন দেখে ফেলেছিলেন ঊর্বশির শরীর, তখন দেবতাদের বিধান মেনে স্বর্গলোকে ফিরে যেতে হয়েছিল অপ্সরাকে। সম্পর্কের স্বাভাবিকতা নাশে স্বয়ং স্বর্গবাসীরাই যেখানে চক্রান্তে সামিল, সেখানে রভি বর্মার জন্য তো বরাদ্দ ছিল নরকের অধিক মানুষের মর্ত্যলোক। ফলত ‘প্রেরণা’ সুগন্ধার (নন্দনা সেন) অনাবৃত শরীরে যেদিন ছবির রভি বর্মা (রণদীপ হুডা) আবিষ্কার করলেন তাঁর পুরাণকে, তখনই অশ্লীলতার দায়ে পড়তে হল তাঁকে। অথচ পুরোটাই ছুতো। ধর্মের নামে ব্যবসায়ে সামিল হতে অমত বলেই তো নেমে এসেছিল বয়কটের খাঁড়া। অথচ তাঁর ছবিই মন্দিরের বাইরে থেকে দেবতার ধারণাকে এনে দিয়েছিল সাধারণের মধ্যে। তার জন্যে অবশ্যই অবদান ছিল প্রিন্টিং প্রেস স্থাপনের। শিল্পকে অবিকৃত রেখে সাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে সেদিন যে মস্ত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন একজন শিল্পী গণতন্ত্রের সংজ্ঞা তার অদূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। দুর্ভাগ্য সেদিন সেই দূরত্ব কমিয়ে দেওয়ার কথা ছিল যাঁদের, তারাই অভেদ্য পাঁচিল তুলে দিয়েছিল। আজও আমরা যে সব দেব দেবীর মূর্তি দেখি তার অনেকগুলোই রভি বর্মার আঁকা। সাধের সেই প্রিন্টিং প্রেসও তিনি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। শিল্পের কারবারী পার্টনারের টাকা মিটিয়ে, উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে দিয়েছিলেন মোশন পিকচারের প্রোজেকশনে উৎসাহী এক যুবককে, যিনি পরে বিখ্যাত হবেন দাদাসাহেব ফালকে নামে।
শিল্পীর স্বাধীনতা বনাম সামাজিক বেড়ি, নিখাদ শিল্প বনাম শিল্প ব্যবসা, সুন্দর উপাসনার জীবন ধর্ম বনাম শৌখিন ধর্ম ব্যবসার রাজনীতিই নামাবলী করে জীবনের গায়ে চাপিয়ে নিয়েছিলেন রভি বর্মা। আসলে সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা যাঁর স্বধর্ম সময়ের চাবুকই যে তাঁর নিয়তি, তা বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন। ফলত যে সুগন্ধার অবস্থান কল্পনার বাইরে কোনওদিন ভেবেই দেখেননি শিল্পী, সেই সুগন্ধাকেই মাথা পেতে মেনে নিতে হয়েছে পুতিগন্ধময় জীবনের বাস্তবতাকেও। কাজের জবাবদিহি দিতে দিতে যেদিন সেই সত্যকে দেখতে পেলেন শিল্পী, সেদিন অনেক দেরী হয়ে গেছে। বাস্তবের প্রহার ততোদিনে শিল্পের প্রেরণাকে এগিয়ে দিয়েছে আত্মহননের পথে। জীবনের আয়রনি এ তো বটেই, তবে এহেন জীবনকথাই নাকি শতক পেরিয়ে এসে আর এক শিল্পীকে ‘লংগেস্ট প্রেগনেন্সি’র যন্ত্রণা দিয়ে গেল। এইই বা কম আয়রণি কী!

পরিচালক হিসেবে কেতন মেহতা এ ছবিতে কেমন, আরও কতখানি রিয়্যালিস্টিক হতে পারত তাঁর রভি বর্মা, মেক আপ নিয়ে আরও ভাবনাচিন্তার অবকাশ ছিল কি না, এতগুলো গান না ব্যবহার করেই ছবি এগিয়ে যেতে পারত কি না, সে সব প্রশ্ন আপাতত গৌণ। পরিচালক নিজেই তথাকথিত আর্ট হাউস ফিল্ম আর কমার্সিয়াল ফিল্মের মধ্যখানে তুলে রাখা ‘বার্লিন পাঁচিল’কে স্বীকার করেন না। তাঁর ভাষা তাই স্বতন্ত্র। নগ্নতার নন্দনতত্ত্বে মণি কউল যেভাবে সাজিয়ে রাখেন তাঁর রাজকুমারীকে, কেতন তাঁর সুগন্ধাকে সেভাবে সাজাবেন না সেটাই প্রত্যাশিত। রভি বর্মার মতো একজন শিল্পীর জীবন ছবিতে তুলে রাখতে গিয়ে কেতন অন্তত রঙ আর দাগের মধ্যে তফাৎটা বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন। শতক আগের এক শিল্পীর জীবনের এসেন্সকে শিল্পের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা দেওয়াতেই তাঁর সাফল্য। এবং ‘রঙ রসিয়া’ সেই ধরনের ছবি, যা সিনেমাকে পরিচালকের মাধ্যম হিসেবে মনে করিয়ে দেয়। তাই রণদীপ, নন্দনা কিংবা পরেশ রাওয়াল এখানে আখ্যানের অংশমাত্র অতিরিক্ত কেউই নন।
আখ্যানের বাইরে যা আছে, তা হল, রভি বর্মার জীবনের হাত ধরে ভারতের পরম্পরাকে খুঁজে ফেরা, আছে দেশের সাংস্কৃতিক আত্মাকে আবিষ্কারের খোঁজ। বলিউড যেভাবে জাতীয় পতাকা নাড়িয়ে দেশাত্মবোধের পরিচয় দেয়, বলা বাহুল্য কেতন সে পথে হাঁটেননি।এমন এক জীবন তিনি বেছে নিয়েছেন, যেখানে সংঘাতের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সত্যি, প্রতিহিংসার আগুনের উপর এসে পড়েছে স্বাধীনতার জলস্রোত। যেখানে নগ্নতা ইরোটিকার মুখপত্র নয় বরং নান্দনিকতার মুখবন্ধ। যে দেশ রভি বর্মাকে অশ্লীলতার কাঁটায় বিঁধেছে, সেই দেশেরই তো এক রাজা সিল্পীকে রাজার সমান অধিকারী করে তুলতে তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়েছে। সে দেশেরই এক মহারাজা তাঁর ছবি দিয়ে দেশের প্রথম চিত্র প্রদর্শনীটির ব্যবস্থা করেছে। যে দেশ ধর্মকে প্রতিপত্তি রক্ষার বর্ম করে, সেই দেশই তো উদযাপন করে জীবনে সুন্দরের ধর্মকে। যে দেশ নগ্নতাকে নরকগামী বলে ভণিতা করে, সে দেশেরই তো মন্দিরগাত্রে সাজানো আছে নগ্নতার নক্ষত্রমালা। এই বৈপরীত্যে মন্থন করলেই দেশের লক্ষ্মী উঠে আসেন অমৃত হাতে। ওভারসীজ বাণিজ্যের হিসেবখাতা তার হিসেব না রাখুক, তবু, এ যদি আমার দেশ না হয় তবে কার দেশ!
বলিউড যেভাবে ইন্ডিয়াকে দেখে, আর ‘রঙ রসিয়া’ যে দেশকে খোঁজে সে দুইয়ের মানচিত্রগত শরীর তাই এক হলেও, আত্মা আলাদা। এ ছবি যদি বাণিজ্যিকভাবে সাফল্যও পায়, তাও বলিউডের অভ্যন্তরে বিশেষ হেলদোল হবে না। তবে দর্শককে এ ছবি নিসন্দেহে তৈরি করে দেয় ‘ইন্ডিয়া’ থেকে দেশে ফেরার পরিসর। ইতিহাসের মুক্তমঞ্চ যেখানে বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্যের ব্যাকরণের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, দাগ আচ্ছা নেহি হ্যায়। দাগের ঘোলাজলে নয়, আমাদের গন্তব্য ছিল সুন্দরের উৎসবে, জীবনের রঙমহলে।

আপনার মতামত জানান