শুধু যাওয়া আসা...

অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়

 


রেখেছি আজ শান্ত শীতল ক’রে
অঙ্গন মোর চন্দনসৌরভে।
সেরেছি কাজ সারাটা দিন ধরে,
তোমার এবার সময় কখন হবে?

এই ক’টি লাইন... সেখান থেকে আঁজলা ভরে কয়েক কুচি অপেক্ষা নিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া যেন লক্ষীর ঝাঁপি থেকে অনবধানে মাটিতে ছড়িয়ে যাচ্ছে সোনার গুঁড়োর মতো কিছু ধান... সেখানে মাথা তুলছে ঢলঢলে ক’টা গাছ... দুলছে... অপেক্ষায়... লাল মেঝেতে যেন পায়ের জলছাপ দিচ্ছেন লক্ষ্মী... শুকিয়ে যাচ্ছে... অপেক্ষায়... শহরের অনেক ঘর থেকে লক্ষী যখন তাঁর আসন তুলে নিচ্ছেন, নিজেদের বিচূর্ণ সংসারের ভালোবাসার বাসাটিকে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য উদয় অস্ত পরিশ্রমের হালে নিজেদের যুতে নিয়েছে যে দুই শালিখ... এক শালিখ সকালে উড়ে যায় দানার খোঁজে... বাসায় একলা সকাল কাটায় অপরে; অপেক্ষায়... আবার সে যখন কুলায় ফেরে... যখন সন্ধ্যা হয়ে আসে... সোনা-মিশোল ধুসর আলো যখন ঘেরে চারিপাশে... উড়ে যায় তখন অন্য শালিখটি... সারাটা দিন তাদের দেখা হয়না... একে অপরের বিম্ব তারা কেবল প্রত্যক্ষ করে- একের করে আনা বাজারে, অপরের রেঁধে দেওয়া মাছের ঝোলে... একের কেচে রাখা কাপড়ে, অন্যের সেলাই করে রাখা জামায়... গোধুলির দরজায় আর ভোরের খুব কাছে দাঁড়িয়ে একে অপরের ঘুম ভাঙ্গানিয়া মোবাইল মিস্‌ড কলে... কেউ কোনও কথা বলেনা... বাড়ি খাঁ-খাঁ করে... আবহের চালচিত্রে কেবলমাত্র অপরিত্যাজ্য নাগরিক কলরব... জলের পাম্প চলছে... বেড়াল ডাকছে... ফিরিওলা... শিলকাটাও... আর শোনা যাচ্ছেনা... তবু শুনতে পাচ্ছি... বিরস দিন, বিরল কাজ, প্রবল বিদ্রোহে, এসেছো প্রেম এসেছো আজ কি মহা-সমারোহে... মনে পড়ছেনা এমন তুমুল প্রেমের ছবি শেষ কবে দেখেছি! জানিনা সারাক্ষণ নির্বাক বয়ানে এমন বাঙময় প্রেমের কাব্য লিখেছে কোন ছবি! তাই প্রথমেই ধন্যবাদ আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত আপনাকে। জীবনের প্রথম ছবিতেই অনেক কিছুই বলে দিলেন কোনও কথাই না বলে!
কাহিনী? নেই এ ছবিতে। প্রেক্ষাপট... আছে- ভীষণ আবছা হয়ে আসা জলরঙের ছবির মতো- দুনিয়া জোড়া মন্দা কবলিত কলকাতা আর এক অংশের কর্মহীনতা, অনটন। কিন্তু তা নিয়ে নেই বহুচর্চিত রাজনৈতিক কথার পুনঃপ্রবাহ। ছবির প্রধান (এবং একমাত্র) যে দুই পাত্রপাত্রী তাদের টোনাটুনির সংসারেও আছে অনটন। তবু সকালের ক্ষুদ আর রাতের কুঁড়োর যোগাড়টা তারা করতে পারে। আর তা করতে গিয়েই বউ সকালে যায় কারখানায়। প্যাকিং-এর হিসেব রাখতে। এদিকে একলা ঘর আগলায় বর। বাজার করে। কাপড় কাচে ... তারপর... দিনের দাহ যখন জুড়োয়, সব কাজ যখন ফুরোয়, সারাটা দিন যখন কাটে... সামনে আসে বাক্যহারা স্বপ্ন-ভরা রাত... বউ ফেরে... কিন্তু তার আগেই বরের সময় হয় কাজে যাওয়ার। রাত জেগে দুনিয়ার খবর গুলোকে কালি মাখিয়ে কাগজে ছাপানো তার কাজ। আর বউ এর এই আসা আর বরের ওই যাওয়ার মাঝে যোগসূত্র হয়ে থাকে রান্নাঘরের খড়খড়ি জানলার চৌকাঠে রেখে যাওয়া দরজার চাবি এবং ঝাঁপি ভর্তি মুহুর্ত। এবং সেই মুহুর্ত বোঝাতে গিয়ে সাহায্য নেওয়া শটের পর শটের, দৃশ্যের পর দৃশ্যের বিন্যাসের। এবং আগাগোড়া সেই বিন্যাস জুড়ে শুয়ে থাকে অপেক্ষারত ভালোবাসা! তবে শট গুলি বড়ই মনোহর! দৃশ্যের বিন্যাস বড়ই নয়নাভিরাম! দুই বারান্দার মাঝখানে টাঙানো দড়িতে শুকোতে দেওয়া কাপড়, চানঘরের নোনা ধরা চৌবাচ্চার থির জল, আঁশ ছাড়ানো ছটফটানো মাছ, কাঁচা নর্দমার পাশে বেড়ালকে খেতে দেওয়া মাছের কাঁটা, জল শুকিয়ে যাওয়া কড়ায় ঢালা সরষের তেল, একের পর এক শিশিতে ঢালতে থাকা চাল-ডাল-গুঁড়ো মশলা, কিংবা পশ্চাৎপটে কাঁসর-ঘন্টার শব্দ নিয়ে বাসায় ফিরে আসা পায়রাদের অনবদ্য একটি শট... সবকিছুই যেন একটু বেশীরকম ‘সাজানো’! কিন্তু বাস্তবে কি হয় এমন? প্রথমে তাই একটু ধাক্কা লাগে। কিন্তু সিনেমা তো বাস্তব নয়! বাস্তব হওয়ার কোনও দায়ও তো তার নেই! বাস্তবের খুব কাছাকাছি সে দাঁড়াতে পারে কেবল। আর এ ছবি তো বলেই শাপগ্রস্ত খন্ডহরের মধ্যে কিভাবে জ্যান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ভালোবাসা! আর বাস্তব যতই কষায় হোক, তাতে ভালোবাসার মিছরি চরিত্র কি পালটায়? তাই চরিত্রদয়ের চোখ দিয়ে দেখলে চারপাশে তো এমনই মায়া, এমনই লাবণ্য চোখে পড়ার কথা! আর এমন মায়াময় অপেক্ষার যতিচিহ্ন হয়ে আসে ‘উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা’, ‘তুমি যে আমার’, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ’... সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আর গীতা দত্তের মধুক্ষরা কন্ঠ।
আর অপেক্ষার অবসান?... শহর তখন সবে সবেই চোখ চাইছে... আড়মোড়া ভাঙছে হাই তুলতে তুলতে... মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে... উনুনে সবে পড়ছে আঁচ... অপেক্ষার শেষ ঘটানোর তীব্র আকুতি ধরা পড়ে প্রায় দু’মিনিট ধরে চলা সাইকেলের চাকার শটে। বউ তখন কাজে বেরোবে বলে তৈরী। এমন সময় ঘরে ঢোকে বর। বউ চমকে তাকায়। বর আদর করে বউকে নিয়ে বসে খাটে। শীত কুয়াশার ওম জড়ানো পাহাড়ের কোলের পাইন-শালের বনে তাদের শয্যা পাতা। অনেক্ষণ তারা বসে থাকে। ওইভাবে। চুপচাপ। বউ একসময়ে উঠে বরের জন্য চা নিয়ে আসে। তারপর হঠাৎ ঘড়ি দেখে, দেখে কাজে বেরোতে দেরী হয়ে যাচ্ছে। একটা নির্বাক হাসি দিয়ে বউ বেরিয়ে যায়। বর চায়ের কাপ হাতে এসে দাঁড়ায় দোতলার জানলায়। উনুনের ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে গলি। বউ মিশে যায় ওই ধোঁয়ায়। আর ওই ধোঁয়া আর দোতলার জানলার মাঝে ফের একটা অপেক্ষার সেতু রচনা করে বিসমিল্লার তিলোককামোদ গাইতে থাকে-

অচিন-শূন্যে-ওড়া পাখি চেনে আপন নীড়,
জানে বিজন-মধ্যে কোথায় আপন-জনের ভিড়।
অসীম আকাশ মিলেছে ওর বাসার সীমানাতে-
ওই অজানা জড়িয়ে আছে জানাশোনার সাথে।
তেমনি ওরা ঘরের পথিক, ঘরের দিকে চলে
যেথায় ওদের তুল্‌সিতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে।




ছবিঃ- আসা যাওয়ার মাঝে (Labour of Love)
পরিচালনাঃ- আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত
অভিনয়ঃ- ঋত্বিক চক্রবর্তী, বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়


আপনার মতামত জানান