বাদশাহী কেলেঙ্কারি

অরুনাভ গঙ্গোপাধ্যায়

 


অনেকদিন আগে একটা কবিতা শুনেছিলাম।

কবিতার শীর্ষক ছিলঃ-
“আমি জলে ঝাঁপ দিলাম”

এবারে কবিতাটা বলিঃ-

“ঝুপ”।

কবিতা শেষ।


আজকে একটা সিনেমা দেখে এলাম।

সিনেমার নামঃ- “বাদশাহী আংটি”

সেই সিনেমা নিয়ে একটা রিভিউ লিখতে বলা হয়েছে আমায়। আচ্ছা।
লিখব।
লিখছি।
লিখলাম।
পড়ে দেখুন- “কেন?”

রিভিউ শেষ।

কিন্তু সম্পাদক বলল, আর একটু বাড়া (সম্পাদক আমাকে তুইতোকারিই করে, কেউ কোনও অসভ্য কথা ভাববেননা)।

তাই বাড়ালাম। আর এই বাড়াবাড়িতে আপনাদের মানে যারা এই ভিউ পড়বেন তাদের বাড়ি মাথায় উঠলে এই কম্পানি দায়ী নয়।

যাকগে যাক...

প্লাম কেকের এই মরসুমে বাঙালী এখন মহা ফাঁপড়ে। একেই সারদা... ম.মি.-র গ্রেফতারির প্রতিবাদে মুহুর্মুহু ধর্না-অবরোধের ঠেলায় নাজেহাল প্রাণ ওষ্ঠাগত... তার ওপর বক্সী- মিত্তির একসাথে হানা দিয়েছে! কোথায় যাবে বাঙালী? উত্তর সহজ- দুটোতেই যাবে। এবং যাওয়া তো অবশ্যই উচিৎ! দুটো যুগের ঠিক চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন পুরুষ- তাদের চাক্ষুষ করবনা! তাই আমিও গেলাম... মিত্তির বাড়ি... এবং গিয়ে ইস্তক... বিশ্বাস করুন... এত প্রাণখুলে আমি বহুদিন হাসিনি! হাসতে হাসতে আমার মাঝে মাঝে গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করছিল! ‘ঝুপ’ করে!
এমনিতে কেউ কেউ বলেন (কেন বলেন ভগাই জানে!) যে ‘বক্সী’তে নাকি ‘মিত্তির’-এর তুলনায় সাহিত্যগুণ বেশী! আলংকারিক শব্দবেষ্টিত বাংলা রচনা অবশ্যই উঁচুমানের সাহিত্য! তা’বলে ঝরঝরে পেটানো শরীরের মেদহীন চাবুক লেখনী সাহিত্য নয়! খোদায় মালুম! অযুত বার তা ক্লাসিক সাহিত্যের পর্জায়তেই পড়ে। আর এ হেন একটি বই- বাদশাহী আংটি নিয়ে সন্দীপ বাবু বানালেন ‘দেখার মতো একটি শ্রুতিনাটক’। তবে তাই বা বলি কেন? শ্রুতিনাটকেও তো একটা আলাদা চিত্রনাটক থাকে! এখানে তো বইয়ের পুস্তানি থেকে শুরু করে শেষ পরিচ্ছেদের ‘দাঁড়ি’ অবধি টোকা! কোথায় চিত্র? নাটকই বা কোথায়? ক্লাসে মাঝে মাঝে মাস্টারমশাই দিদিমনিরা ত্যাঁদোড় ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দকে দাঁড় করিয়ে কোন বই থেকে বিশেষ কোনও চ্যাপ্টার পড়তে দেন, তখন সেইসব পিউপিলরা যেভাবে আন্তাবড়ি রিডিং পড়ে এই ছবি ঠিক তাই। ঠিক ঠিক তাইই!
সন্দীপ বাবু মাঝে মাঝেই বলেন তাঁর বাবার লেখা থেকে চিত্রনাট্য করতে সবথেকে সুবিধে হয় কারণ তাঁর বাবার গল্পতে চিত্রনাট্য প্রায় করা থাকে! হ্যাঁ থাকে! তো কি? “সোনার কেল্লা” এবং “জয় বাবা ফেলুনাথ”-এর গল্প তো বাবা-ই লিখেছিলেন, সেখান থেকে ছবিটাও বাবা বানিয়েছিলেন, এবং চিত্রনাট্যও বাবা’র! কিন্তু সে দুখানি চিত্রনাট্য তো বোধহয় ছাপিয়েছিল গল্পকেও! তার দৃশ্যায়ন কল্পনা করলে তো এখনও শিরশিরানি খেলে যায় রক্তে! চিত্রনাট্য বস্তুটা তৈরী হয়েছিল কেন তাহলে? গল্পের লাইন বাই লাইন টুকে শহরের অলি-গলি-তস্য গলির জায়গায় জায়গায় ক্যামেরা (এ ছবিতে শীর্ষ রায় ক্যামেরা করেছেন, এবং বেশ বাজে করেছেন) বসিয়ে শুধুই ছবি তোলার জন্য?... এতখানি পড়ে যারা বুঝতে পারেননি যে এই ছবিতে ওই চিত্রনাট্য বস্তুটি নেই তাদের জন্য আরও কিছু...
এমনিতে বাদশাহী আংটি করা খুব রিস্ক! কেননা জটায়ু নেই! বড়পর্দার ক্ষেত্রে ফেলু-তোপসে-জটায়ু – এই ট্রায়ো এক ধ্রুবতে পরিণত হয়েছে। তবু সন্দীপ বাবু এই গল্প বাছলেন- বললেন ফেলুর প্রথম দিকের গল্পের সাথে এবার পরিচয় করানো যেতে পারে।... বলছি আর কত পরিচয় হবে?! ফেলু তো আমাদের বাড়ির লোক! তবু যদি ‘রি-পরিচয়’ করাতেই হয়, সেক্ষেত্রে তো চলচ্চিত্রের ধর্ম মেনে ... ওই... চিত্রনাট্য লিখতে হয়! সাজাতে হয় ঘটনা পরম্পরা! তৈরি করতে হয় রুদ্ধশ্বাস মুহুর্ত! দিতে হয় মোচড়! কোথায় গেল সেগুলো? সেগুলো কি “আগেকার দিনের সাধু সন্ন্যাসীদের মতো ভ্যানিশ হয়ে গেল?”
বইয়ের ঘটনার পর ঘটনা থেকে কত অসামান্য সব ফ্ল্যাশব্যাক মুহুর্ত তৈরী করা যেত!... যেমন পিয়ারিলালের পর্ব... সেখানে কি হল? না একটা চার আনা দৃশ্যে দেখা গেল বনবিহারী একটা বাক্স বন্দী ব্ল্যাক উইডো নিয়ে গেলেন পিয়ারীলালকে ভয় দেখাতে; বাক্সটা পিয়ারীলালের সামনে মেলে ধরলেন; পিয়ারীলাল আঁআঁ আঁআঁ করে চোখ উল্টে পড়ে গেলেন!... লক্ষ্ণৌয়ের নবাবী মেজাজকে ধরা যেত কত রাজকীয় কায়দায়!... বদলে কি হল? না বড়া ইমামবড়ায় ফেলুদা এন্ড কোং ঢুকলেন ক্রোমাতে চেপে(যারা জানেননা ক্রোমা কি তাঁরা প্লিজ কষ্ট করে একটু গুগ্‌ল করুন)!!! হা ঈশ্বর!!!... তবে গুগ্‌ল করার দরকারও নেই! দেখলেই বুঝবেন ‘কেলো’ কোন স্তরে পৌঁছতে পারে!... আর বনবিহারীর চিড়িয়াখানা! জানোয়ার জোগাড় অসুবিধে তাই হল সাপের বিষের ব্যবসা... ঠিক আছে! কিন্তু তাহলে সাপের ঘরে শুধু একটি মাত্র র্যা টেল স্নেক কেন?? যেহেতু বইতে আছে তাই!! তাই জন্যই শুধু দুটি নীল বিছে আর একটি কালো বিধবা মাকড়সা!!... দায় এমন ভাবে সারতে হয় বুঝি!! হরিদ্বারের গঙ্গাকেও তো করে তোলা যেত রহস্যের আকর!... যেতনা কি?... বদলে তা হয়ে গেল “ইন্‌ক্রেডিব্‌ল ইন্ডিয়া’”-র বিজ্ঞাপন!... আর আবহসঙ্গীতের এমন মারকাটারি দৈন্যের দশা কেন? একটা রহস্যের ছবিকে তো আরও যোজন খানেক এগিয়ে নিয়ে যায় সঙ্গীত! কত দুরন্ত মুহুর্ত স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরে গেল সঙ্গীতের কার্পণ্যে এবং অভাবে!... ফেলুদা যখন টাঙ্গা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছুট লাগালো দুর্বৃত্তের পেছনে... কি অসাধারণ চেজিং সিকোয়েন্স হয়ে উঠতে পারত তা! কিংবা যখন সবাই মিলে ভুলভুলাইয়াতে... যদি আছড়ে পড়ত কোনও নবাবী বাজনা কিংবা ওয়াজেদ আলির ঠুম্‌রী-দাদরা!... কিছুই হোলনা! বদলে হূ হূ শূন্যতা ঢেকে দিল সবকিছুকে! আর সেই রাতের ট্রেনে হরিদ্বারে যেতে যেতে জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে বনবিহারী বাবুর টেপ রেকর্ডারে শোনা হায়নার হাসি, র্যা টেল স্নেকের করকরানি... সেই গা ছমছমে অনুভুতির গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটল ফটফটে দিনের আলোয়! একটা রাতের ট্রেন যোগাড় করা গেলনা!
এবং অভিনয়... পরান বাবুর বনবিহারী রিপিটিটিভ, দীপঙ্কর দে কিংবা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী কিংবা রজতাভ দত্ত ভালো তবে তাঁদের নতুন কিছুই দেওয়ার ছিলনা। পিয়ারীলালের ছেলে মহাবীরের ভূমিকায় কথা বলায় অবাঙালী টান বজায় রাখতে তথাগত মুখোপাধ্যায় সারাক্ষণ অমন দাঁত চিবিয়ে কথা বলেন কেন সেই রহস্যের সমাধান কোনও বক্সী কি মিত্তির কেউই করতে পারবেন বলে মনে হয়না। আর নতুন তোপসে- সৌরভ- মাঝে মাঝে চোখ দুটো কথা বলেছে, তবে বাকি সময়টা উনি কথা না বলে চুপ করে থাকলেই ভালো করতেন! ঈঈঈশ্‌শ্‌শ্‌শ্‌শ্‌শ্ ‌শ্‌শ্‌!!! আর আবির- উনি তো এমনিতেই স্মার্ট, এবং সত্যি বলতে এই গল্পের অলংকরণের সাথে ওনার চেহারা বেশ সুন্দর মানিয়ে গেছে, অভিনয়টাও মন্দ করেননি, এবং যে রেব্যান-এর সানগ্লাসটা পরেছেন সেটাও বেশ ভালো... তবু বলব... উনি বক্সীবাগান ত্যাগ করে মিত্তির বাড়িতে এসে না ঢুকলেই পারতেন... ভুল করলেন! তবে বাদশাহী আংটির ডিজাইন টা বেশ ভালো... এবং সন্দীপ বাবুকে ধন্যবাদ সন্দেশে প্রকাশকালে বড় রায়মশাই গল্পের যে নামাঙ্কনটি করেছিলেন সেই অল্প দেখা নামাঙ্কনটি ছবির পোস্টারে নিয়ে আসার জন্য।
আর কি!... আর বলার আছেটাই বা কি?... আসলে কি বলুন তো বড় হয়ে উঠতে উঠতে... উঠতে উঠতে... আমরা প্রত্যেকেই তো একেক জন তোপসে হয়ে উঠেছি... তাই চোখের সামনে ফেলুদাকে এভাবে ভিলেনের(ভিলেনটি কে বুঝে নিন)হাতে হেরে যেতে দেখলে খারাপ লাগে!
কষ্ট হয়!
দুঃখ হয়!
ছবি দেখে যখন বাড়ি ফিরলাম দেখলাম একটা চ্যানেলে একটা পুরোনো দিনের বাংলা ছবি হচ্ছে। ডিজিটালি রিমাস্টার্ড ভার্সান। ঝাঁ চকচকে। সেখানে ছবির দুই নায়ককে বন্দী করে রাখা হয়েছে। একসময়ে মনের দুঃখে এক নায়ক গরাদের পেছনে বসেই গান ধরে- “দুঃখ কিসে হয়?”
অপর নায়ক প্রশ্ন করে- “সত্যি! কিসে হয় বলোতো?”

বুঝতে পারলেনন তো রিভিউটা প্রথমে শুধুমাত্র “কেন” দিয়ে কেন শেষ করেছিলাম?

আপনার মতামত জানান