বেঁচে থাকা বাঙালির ছবি

বিশ্বজিৎ রায়

 


১৯৭৯ । হৃষীকেশ মুখার্জির ‘গোলমাল’-এ অমিতাভ বচ্চনের গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স । আমার আপনার মতো মধ্যবিত্ত বাড়ির বেকার ছেলে অমল পালেকর ইন্টারভিউ দিতে যাবে । পাজামা পাঞ্জাবি পরে ইন্টারভিউ দিতে গেলে নাকি সাবেকি মূল্যবোধের মানুষ উৎপল দত্তের ফার্মে চাকরি পাকা । তাই স্টুডিওতে এসেছে বন্ধুর কাছে পাজামা-পাঞ্জাবি ধার নিতে । স্টুডিওতে অনেক নায়কের জন্য অনেক পাজামা-পাঞ্জাবির ব্যবস্থা । অমল পালেকর স্টুডিওতে ঢুকছে, অমিতাভ বচ্চন তখন শুটিং শেষ করে বাড়ি যাচ্ছেন । অমিতাভের সঙ্গে, বন্ধু, অমল পালেকরের আলাপ করিয়ে দেয় । ১৯৭৯ তে অ্যাংরি ইয়াংম্যান অমিতাভকে কে না চেনে ? ১৯৭১-এ হৃষীকেশের আনন্দ ছবিতে অমিতাভ বাঙালি ভদ্রলোক বাবুমশাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করে বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টরের পুরস্কার পেয়েছিলেন । হৃষীকেশ যে রকম ছবি করতেন অমিতাভ অবশ্য সেই জাতীয় ছবিতে আটকে থাকেননি । ১৯৭৩ এ ‘জঞ্জির’ – অমিতাভ অ্যাংরি ইয়াংম্যান হয়ে উঠলেন । হৃষীকেশ অমিতাভ-জয়াকে নিয়ে ‘অভিমান’(১৯৭৩) ‘চুপকে চুপকে’(১৯৭৫) করেছিলেন – তবে ওই অ্যাংরি ইয়াংম্যানের দাপটে যেন ঘরের ছেলে মধ্যবিত্ত মানুষ অমিতাভ ঢাকা পড়ে যান । ১৯৭৯-র ‘গোলমাল’ ছবিতে স্টুডিও থেকে অমিতাভের চলে যাওয়া আর পাঞ্জাবি ধার নিতে অমল পালেকর-এর ঢোকা তাই যেন প্রতীকী বলে মনে হয় । অমিতাভ ঢিশুম-ঢুশুম লার্জার দ্যান লাইফ হিরো, আর অমল পালেকর ঘরের ছেলে । প্রথমেই তার জন্য যে পাঞ্জাবিটা এলো সেটা মস্ত বড়ো , গায়ে হল না । বন্ধু বলল এ অমিতজির । অমল পালেকর আর অমিতাভ দুজনের পথ যেন আলাদা ।
অমিতাভ লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজের হাত থেকে সহজে রেহাই পাননি । বয়স হচ্ছিল তাঁর । ফিল্ম-ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই কিন্তু রাগী যুবকের খোলসটি থেকে তাঁকে মুক্তি দিতে চাইছিলেন না । বয়সের সঙ্গে এই খোলস খুবই বেমানান । ‘অগ্নিপথ’, ‘খুদাগাওয়া’, ‘ইনসানিয়াত’ নয়ের দশকে অমিতাভের ছবি ক্রমাগতই ফ্লপ হচ্ছিল । ১৯৯৬-তে এ বি সি এল (Amitabh Bachchan Corporation Ltd ) গড়ে উঠল । এ ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই । অমিতাভ এই লড়াইতে ক্রমশই যেন হিরো থেকে টাটকা চরিত্র হয়ে উঠলেন । এমন একজন মানুষ যিনি একেবারে হেরে যাওয়া অবস্থা থেকে আম আদমির মতো লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন । বাগবাঁ(২০০৩), বিরুধ(২০০৫), ব্ল্যাক(২০০৫), পা(২০০৯) – অমিতাভ আর হিরো মাত্র নন, চরিত্র । এই অমিতাভকেই ‘পিকু’তে ব্যবহার করেছেন সুজিত সরকার। বউ মারা গেছেন । দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে মেয়ের সঙ্গে থাকেন সত্তর বছরের অমিতাভ । একমুখ খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি, চোখে চশমা । খিটখিট করেন । শরীর নিয়ে বাই আছে । পেট খোলসা হয় না সহজে । সেটাই সারাদিন মাথায় ঘুর-ঘুর করে । মেয়ে অফিস গেলেও নিস্তার নেই । বাবার মেসেজ – খোলসা যেটুকু হল তার রূপবর্ণন । চিত্তরঞ্জন পার্কের বাঙালির আদি বাড়ি কলকাতায় । মস্ত সে বাড়িতে ভাই থাকেন । প্রোমোটার বাড়ির পেছনে ঘুর ঘুর করে । বুড়ো সত্তর বছরের অমিতাভ বাড়ি বেচতে নারাজ । মেয়ে অবিবাহিত । তার মানে এই নয় যে সে ভার্জিন । মেয়ের অবিবাহিত যাপনে ‘সেক্স লাইফ’ আছে বাবা জানেন, তবে তাই নিয়ে বাবার খুব একটা বিরাগ নেই বরং স্পষ্ট বক্তব্য আছে । আসলে এ ছবির গল্প তো সামান্যই । দিল্লি থেকে গাড়ি করে কলকাতা । গাড়ির মালিক ড্রাইভ করে এনেছেন তাঁদের । কারণ ড্রাইভাররা অমিতাভের মুখরা মুডি মেয়েকে নিয়ে যেতে চায় না। বাপেরই মেয়ে তো । কলকাতায় এসে অমিতাভ নিশ্চিন্তে ঘুমের মধ্যে হৃদরোগে মারা যান। মারা যাওয়ার আগে বাড়ি বিক্রি হবে না জানিয়ে দেন, সাইকেলে করে সত্তরের অমিতাভ ফেলে যাওয়া কলকাতাকে দুচোখ ভরে দেখেন । শ্যামবাজারের মোড়ে কচুরি খান, বাড়ির জন্য কচুরি কেনেন । আর অনেকদিন পর সেদিন কোষ্ঠ পরিষ্কার হয় । কী যে আনন্দ ।
গল্পের নাটকীয়তায় এ ছবি স্মরণীয় নয়, এ ছবি বাঙালিয়ানার নানা চিহ্নকে বহন করছে । মধ্যবিত্ত বাঙালি পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও মুদ্রাদোষের অসামান্য ব্যবহার ছিল নির্মল দে’র ‘সাড়ে চুয়াত্তর’(১৯৫৩) ছবিতে । গল্প লিখেছিলেন বিজন ভট্টাচার্য । উত্তম-সুচিত্রার জন্য নয়, সাড়ে চুয়াত্তর স্মরণীয় বাঙালিয়ানার নানা প্রাত্যহিক অভ্যেসের চিত্রায়ণের জন্য । সাংস্কৃতিক শালীনতার দাপটে শরীরের অনেক বিভঙ্গ ও কৃত্যকে শিল্প-সাহিত্য থেকে বাদ দেওয়া হয় । বিশেষ করে পেটের নীচে যেন মানুষের শরীরের অস্তিত্ব নেই । ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ তা করেনি । মেসবাড়ির পুরুষদের সকালবেলার সে অনবদ্য ছবি -- আসন করার, গান গাওয়ার, পেট যাতে খোলসা হয় তার চেষ্টা করার । জল খেয়ে পায়চারি করতে করতে পেটে হাত বোলানো । ‘আমার এ যৌবন’ গানের আগে পরে কলকাতার মেস বাড়িতে নানা বাঙালি ‘পুরুষের শরীর’ ও ‘শারীরিক বিভঙ্গ’ এই ছবিকে এক শ্রেণীর বাঙালিয়ানার ক্যানভাস করে তুলেছিল । এই বাঙালিয়ানার চিহ্নগুলোকে আমরা বাংলা সিনেমা থেকে বাদ দিচ্ছিলাম । ফলে কেমন অবাস্তব এক বাঙালি সমাজের ছবি – এর মধ্যে আবার মুক্ত অর্থনীতির দৌলতে মাল্টিপ্লেক্সগামী নব্য ভদ্রলোকদের জন্য একরকমের বাংলা ছবি তৈরি হচ্ছিল । এই সব ছবিতে এত বেশি সুসজ্জিত অন্দরমহল ও একই রকমের অন্তরমহল যে একঘেয়ে ক্লান্তি বশীভূত করে ফেলছিল । এই সজ্জা ও বিন্যাসের জনক ঋতুপর্ণ ঘোষ – প্রথম দিকে তা নতুন রকম লাগলেও, ক্রমশই তা রক্তহীন বলে মনে হচ্ছিল । এই নব্যভদ্রলোকী বাঙালিয়ানার বাইরে আরেকরকম বাঙালিয়ানার চিহ্ন ‘পিকু’র শরীরে । বাঙালিজীবনের পুরনো চিহ্নগুলিকে এখানে স্বাভাবিক ভাবে রাখা হয়েছে – বিধুর ও মেদুরভাবে মহিমান্বিত করা হয়নি ।
ভারতীয় মধ্যবিত্তজীবনের প্রাত্যহিক বাস্তবতা ও জীবনবোধকে কীভাবে নীচুস্বরে প্রায় ছোটোগল্পের মতো করে তুলে ধরা যায় বছর কয়েক আগে ‘লাঞ্চবক্স’(২০১৩) তা দেখিয়েছিল । অভিনয়ের যে ধারায় খুব স্বাভাবিক বাস্তবতায় লার্জার দ্যান লাইফের মহিমা ছাড়া জীবনকে পরিবেশন করা যায় সেই ধারার অভিনয় ভারতীয় দর্শক ‘লাঞ্চবক্স’-এ আবার নতুন করে পেয়েছিলেন । এবার ‘পিকু’তে পেলেন । অভিনেতা অমিতাভের জীবনের ওঠাপড়া আর সিনেমায় বাঙালি জীবনের চিহ্নগুলিকে বাদ দেওয়ার ও ধরার প্রয়াস এই দুয়ের কথা মাথায় রেখে ‘পিকু’ দেখলে চমৎকার সোয়াদ পাওয়া যাবে ।
আর হ্যাঁ, বাবার প্রতি গভীর ভাবে মনোযোগী মা-মরা মুডি মেয়ে পিকু যার বিবাহ নেই, যৌনজীবন আছে ; ন্যাকামি নেই অনুভবী মন ও স্পষ্ট মতামত আছে তাকে অনেকদিন মনে থাকবে । ‘ইলেক্ট্রা -কমপ্লেক্স’-এর ছবি নয় পিকু – বাবা -মেয়ের ছবি, সোচ্চার আত্মপ্রত্যয়ী সমস্ত মুদ্রাদোষসহ বেঁচে থাকা বাঙালির ছবি ।


আপনার মতামত জানান