পিকু , প্যানপেনে বাঙালি গল্প নয়, থ্যাঙ্ক গড

যশোধরা রায়চৌধুরী

 


ছবির সমালোচনা করিনি আগে কখনো । স্বতঃ প্রবৃত্ত হয়ে হিন্দি ছবি পিকু-র কথা লিখতে কেন বসলাম?
ছবিটা দেখতে গেছিলাম মনে মনে নাক কুঁচকে। প্রোমো দেখে মনে হয়েছিল, বড্ড বেশি ব্ল্যাক হিউমার। ডার্ক কমেডির আঁচ ছিল। পেটখারাপ –কনস্টিপেশন-পায়খানা অবসেশন সম্পন্ন এক বৃদ্ধে র ভূমিকায় অমিতাভ বচচন। মহামান্য অভিনেতা। তাই তিনি যা করবেন তাই সই। নায়িকা , কন্যার রোলে , তথা নামভূমিকায়, লাস্যময়ী দীপিকা পাড়ুকোনে।
আর আছেন ইরফান। নিশ্চয় রাগি যুবকের রোল। একটা রোড ট্রিপের আভাসও পেয়েছি। মনে পড়েছে ফাইন্ডিং ফ্যানি নামের সেই সেদ্ধ না হওয়া আঁতলামোর ছবিটির কথা।
ছবি দেখতে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য অভিজ্ঞতা হল। আমি অভিভূত।
না, সেন্টিমেন্টাল/ স্মৃতিতাড়িত বাঙালি আমি নই। এ ছবি আমাকে সেন্টিমেন্টাল করেনি। করেনা। যে গপ্পে আছে এক বাবা ও তার মেয়ে, আর তাদের মধ্যে এক প্রায় ইলেকট্রা-পর্যায়ের সম্পর্ক, পরস্পরের পরিপূরক অথচ আসলে বাবার চারিত্রের কার্বন কপির মত মেয়েটিও ইংরিজিতে যাকে বলে “কোয়ার্কি” , খিটকেল, রাগি, মেজাজি, খুঁতখুঁতে , অধৈর্য ইত্যাদি ইত্যাদি। দুজনের এক ধরণের সিমবায়োসিস বা পারস্পরিক নির্ভরতার ঘুর্নিতে হারিয়ে যেতে বসা সম্পর্ক দেখানো হয়েছে। এই সম্পর্ক সেন্টিমেন্টাল করেনা, কিন্তু সেন্টিমেন্টের ধার দিয়ে সন্তর্পনে হেঁটে যায়। আবার এই ছবি খুব কিনার দিয়ে হেঁটে যায় কালো, দুষ্টু , তীক্ষ্ণ তির্যকতার। ব্ল্যাক কমেডি কিন্তু হতে হতেও হয়না। শ্লেষ নেই, আবার কাঁদো কাঁদো সেন্টুও নেই, এমন এক অদ্ভুত ব্যাপার দেখি এ ছবিতে। যাকে এক কথায় বলা যায়, রিয়ালিটি। বাস্তব।
এ ছবি ভীষণ বাস্তব।
অনেক সমালোচক ইতিমধ্যেই নেট ভরিয়ে লিখেছেন এ ছবি নাকি সিম্পল। সহজ।
গল্পটা সহজ?
আমার ত মনে হয়নি।
বরং পরিচালক সুজিত সরকার আপাত সহজ গল্পের পেছনে পরতে পরতে রেখেছেন অনেক কিছু।
আমার কী কী পরত চোখে পড়ল, বলি।
এক, বাঙলা ও বাঙালির স্টিরিওটাইপ। যা জানি আমরা। সর্বভারতীয় মহলে মিশতে গিয়ে বার বার চোখে পড়েছে “রসুগুল্লা” খাওয়া বাঙালির প্রতি হাসি মস্করা। কিন্তু এ ছবি স্টিরিওটাইপ গড়েও নি, ভাঙেওনি।
মনে পড়ে ভিকি ডোনারের নায়িকাও বাঙালি ব্যাংক কর্মী , দিল্লির। সেও সুজিতেরই ছবি। উনি ইচ্ছে করেই সেই বাঙালিনি ও তার বাবা মাকে দেখিয়েছিলেন স্টিরিওটাইপে। কারণ হিন্দি ছবি সেভাবেই দেখায়। অন্য প্রদেশের ছেলে, বিশেষত পাঞ্জাবি ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে ঘোর আপত্তি ভিকি ডোনারের নায়িকার বাঙালি বাবার। হিন্দি ছবি তামিলিয়ান স্টিরিওটাইপ, বাঙালি স্টিরিওটাইপ, পাঞ্জাবি স্টিরিওটাইপ বার বার তৈরি করে, পেশ করে, বিক্রি করে। এটাই ব্যবসার রীতি।
পিকু তে এসে স্টিরিওটাইপ রেখেও ছাঁচ পালটালেন সুজিত। পিকুর বাবা সবাইকে বলেন “লো আই কিউ”। হ্যাঁ বাঙালিসুলভ । পিকুর বাবা সব সময়ে তর্ক করেন, নিন্দে করেন, খুঁত খোঁজেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, হ্যাঁ নিন্দে তো করবই, আই অ্যাম এ ক্রিটিকাল ম্যান।
হ্যাঁ বাঙালিসুলভ। কিন্তু কী অনাবিল এই বাঙালিয়ানা, যা আমাদের সবার ঘরে ঘরে আছে।
দুই। বাঙালির বাইরেও এ ছবি ভারতীয়। তাই শুধু এক প্রদেশের লোকেদের ছোঁবে না এ। ছোঁবে সব ভারতিয়কে। সব বয়সের ভারতীয়কে। আমার পরিচিত এক ষাটোর্ধ রিটায়ার্ড আই এ এস অফিসার পোস্ট দিয়েছেন, এ ছবির অস্কার পাওয়া উচিত। কেননা এই বৃদ্ধ আমাদের চেনা লোক। আমার মেজমামার সঙ্গে আমি মিল পাই। অন্য কেউ মিল পায় তার পাশের বাড়ির অমুক বাবুর সঙ্গে। কেউ রিলেট করবে নিজের বাবার সঙ্গে। কেউ নিজের সঙ্গে।
হাইপোকনড্রিয়াক বৃদ্ধ, এক বাক্স ওষুধ বয়ে চলা প্রৌঢ়, গাড়িতে বসে সারাক্ষণ টিফিনবাক্স খুলে খেতে থাকা পরিবার, ঝগড়া কিচিরমিচির করা আত্মীয়, এ তো সমস্ত ভারতেরই ছবি। বাস্তব মধ্যবিত্ততা। বিশাল মিডল ক্লাসের ঢেউয়ের একটা ছবি। যে মিডল ক্লাস গিয়ে সিনেমাহলের সিট ভরায়। যারা পর্দার লোকের সুখে দুঃখে হাসে কাঁদে তাদের ছবি।
তিন। ছবিটির নির্মল আনন্দ দেবার ক্ষমতা। ছবিটিতে প্যানপ্যানানির অভাব। সদ্য প্রয়াত যে বিখ্যাত বাঙালি পরিচালক বাংলা ছবিকে পুনরায় জাতে উঠিয়েছেন তিনিও বাবা-মেয়েকে নিয়ে ছবি করেছিলেন। সে ছবিতে অসুখ, কান্না , নীরবতা, সেন্টিমেন্ট, রাবীন্দ্রিকতা একেবারে শ্বাসরোধকারী লেগেছিল আমার। ওই ছবি দেখে বেরিয়ে মন ভাল করার জন্য ফুচকা খেতে হয়। পিকু দেখাটাই ফুচকা খাবার মত, রিফ্রেশিং।
এ ছবিতে দীপিকা ও ইরফান ও অন্যান্যরা যথাযথ। মৌসুমী চ্যাটার্জি আহ্লাদি ও প্রবলভাবে ভালবাসার মত । নিজের মাসির মত।
কিন্তু বাকি আর কাউকে প্রায় দেখতেই পাইনি আমি। অমিতাভকেই দুচোখ ভরে দেখেছি। প্রবলভাবে মুভড হয়েছি এই বয়সে এতটা এনার্জি নিয়ে অভিনয়ের ক্ষমতা দেখে। অমিতাভ তাঁর অসামান্যতা আবার দেখালেন। ওই চরিত্রটিকে প্রতি মুহূর্তে সত্যিকারের একটা লোক মনে হয়, আর অভিনয় যে, তা ভুলে গিয়ে প্রতিমুহূর্তে তার পরেই আবার জোর করে নিজেকে মনে করাতে হয়, যে, এটা আসলে অভিনয়। একেবারে অন্য একটা লোক হয়ে গেছেন উনি এখানে। ভাস্কর ব্যানার্জি জীবন্ত।

কী অসম্ভব ভাল টাইমিং। কী অসম্ভব ভাল কমেডি সেন্স।
খুঁত খোঁজা বাঙালি তো আমিও। তাই কয়েকটা খুঁত দেখেই ফেলেছি। যথা, কচুরি কিনে এনে তাকে “কচৌড়ি” বললেন কেন ভাস্কর ব্যানার্জি? দু ঘন্টায় শ্যামবাজার পাঁচমাথা থেকে ময়দান ভিক্টোরিয়া সাইকেলে ঘুরলেন কী করে? ওঁদের বাড়িটা বাবার আমলে তৈরি বলা হয়েছে, দেখানো হল চকমেলানো প্রপিতামহের আমলের বনেদি বাঙালি বাড়ি। ডিটেলিং এ এই ভুল আশা করিনি। তবে ঐ ধরণের বাড়িতে যে সব প্যাচপ্যাচে বস্তাপচা সেন্টিমেন্টের ছবি তোলা হয়েছে এ যাবত, বাংলা সিনেমার সেই সব উপাদানের ধার দিয়েও না গিয়ে স্মার্ট এক ব্যাপার হয়েছে এখানে। প্রতিটি বারান্দায় একটা করে ঝগড়া আর ফ্ল্যাশ টানার শব্দ দিয়ে গোটা আবহেই চাপা হাসি আর অনেকটা অর্থবহতা।
আসলে, বাঙালি পরিবারকে আধার হিসেবে ধরলেও আসলে এটা একেবারেই একটি হিন্দি ছবি। আম ভারতীয় পাবলিকের জন্য তৈরি। তাই বাঙালিরা নিজেদের মধ্যেও হিন্দি বলছেন। বলবেনই। আর, আম বাঙ্গালির কিছু অবসেশনকে নিয়ে কথা বললেও ( ইরফানকে ননবেঙ্গলি মিস্টার চৌধুরী বলাটা যার তুঙ্গশিখর) , তা মূলধারার ভারতীয় অবসেশনই।
আসলে এ সর্বকালের বাবা মেয়ের গল্প। লিবারাল বাঙালি পেট্রিয়ার্কের ছোট ছোট মুদ্রাদোষ অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে অমিতাভ নিজের বাংলার জামাই-এর নাম রাখলেন, অমিতাভের তো সত্যিই কলকাতায় প্রথম জীবনে চাকরি করার অভিজ্ঞতা আছে, আমাদের এই জানাটাকে সুজিত অতি দক্ষতায় বুনে দিলেন টেক্সটে। সাংস্কৃতিক নানা তথ্য দর্শকের মনের পরতে পরতে কাজ করল। যেমন হৃষিকেশ মুখার্জির “আনন্দ” ছবিতে যে অমিতাভ বচ্চনের চরিত্রটির নাম ছিল ভাস্কর ব্যানার্জি, সেই তথ্য যেই না জানালেন আমার এক বন্ধু, বুঝতে পারলাম, নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা পুরানোদের থেকে কতটা ঋণী তা জানাতে ছোট ছোট ট্রিবিউট রেখেই চলেছেন।
আমার নিজের মায়ের সঙ্গে, আমার বান্ধবী প্রমিতার তার বাবার সঙ্গে, যে সব মিষ্টি তেতো সম্পর্ক ছিল, সব , সব মনে পড়ল, কিন্তু একটুও কান্না পেলনা। কেননা, মেয়েটি যে বাবার রেপ্লিকা। বাবার তেজ নিয়ে শেষ মেশ সেও যে জিদ্দি –ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে বলে গেল, ম্যানেজ করে নিচ্ছি। এই জেদ, রাগ, ব্যক্তিত্বের ট্র্যাডিশনও , আমাদের দেশে সমানে চলেছে।

আপনার মতামত জানান