Labour of Love : ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে

ঋতম ঘোষাল

 


মাঝে মাঝে বাংলা ছবি দেখতে বসে সত্যিই সংশয় জাগতো যে বাংলা ছবি আদৌ বাংলার মানুষদের নিয়ে তৈরি হয় কিনা?অর্থাৎ গোদা বাংলায় বাংলা ছবির চরিত্ররা এই বাংলার মানুষ কিনা। তাঁরা যে অর্ধবিকৃত ফরাসী টানের অথবা ককনি অ্যাক্সেন্টের ইংরেজি এবং অর্ধেক মুখভর্তি কাল্পনিক চিউইং গাম নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বাংলায় কথা বলেন মহার্ঘ্য কফিশপ বা আধো অন্ধকার লিভিং রুমে বসে , তা আমাদের কোন সোশ্যাল স্ট্রাটা কে নির্দেশ করে? তাহলে কি আর মিনিবাসে চড়ে বাঙালি অফিস যায় না?বাজারে গিয়ে কাটাপোনা কেনে না?মাসের শেষে টিউব টিপে টুথপেস্ট বের করে না?নিজেই সংশয়ে পড়তাম। হয়তো তবে মলবিলাসী,ওয়াইনসেবী ,আধাপ্রবাসী সম্প্রদায়ের মনোরঞ্জনই একদা অগ্নিপুরুষ ঋত্বিকের বলা “সব চাইতে শক্তিশালী মিডিয়ামের” ভবিতব্য।আমাদের মোল্লাসুলভ কমফর্ট জোনের দৌড় ছিলো দক্ষিণ কলকাতার কয়েকটি বাছা বাছা অভিজাত ঠেকের মসজিদ অবধি। গোসাপের শীতঘুমে আচ্ছন্ন ,আত্মরতিপ্রবণ এবং নস্টালজিয়ার চৌবাচ্চাকে সমুদ্রভ্রমে মজে থাকা আমাদের কান ধরে টেনে এনে বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করালেন যিনি, তিনিও (কি আশ্চর্য) একজন বাঙালী।আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত।হ্যাঁ, এই গৌরচন্দ্রিকা তাঁর ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ ছবিটিকে নিয়েই।
বড় মিডিয়া হাউসের দাক্ষিণ্যপুষ্ট যে সব বাংলা ‘মুভি’ মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তি পায়,আসা যাওয়ার মাঝে সেইরকম ‘মুভি’ হয়ে উঠতে পারেনি। এখানে চালাক চালাক নেমড্রপিং নেই, সিসিডি নেই, সাউথ সিটি নেই,অনুপম রায়ের বা অরিজিত সিং-এর গান নেই,দুর্বোধ্য গানের লিরিকের সাথে রংমিলন্তি মন্তাজ নেই।মানে যা যা দরকার একটি বক্সঅফিস সফল বাংলা ছবি হয়ে উঠতে গেলে, তার একটিও নেই।বরং আছে যা,তা হলো কারখানায় লকআউটের জেরে শ্রমিকের আত্মহত্যা,বাপুজি কেক দিয়ে উপবাস ভাঙা(ব্রেকফাস্ট নয়), ট্রামলাইনের তার আর গলির মধ্যে হেমন্তের কুয়াশা।
বাজার চলতি (কমার্শিয়াল ছবির কত বলছি না কিন্তু) মধ্যপন্থী বাংলা ছবি দেখতে দেখতে মনে প্রশ্ন জাগতো আদৌ সিনেমা কি আর গণমাধ্যম আছে?যদি সত্যিই শূন্য দশকের বাংলা ছবি আমাদের নতুন কিছু না দিতে পারে, তাহলে অসুখটা কোথায়?আদিত্য শুধু এর উত্তরগুলো নীরব চিৎকারে দিয়ে দেন তাই নয়, উত্তর আধুনিক মাধ্যমটির গন্তব্য লেখা থাকে তাঁর ফিল্মের অঙ্গে অঙ্গে।ঠিক এইখানেই আদিত্য সফল।তিনি সিনেমা বানিয়েছেন।প্যাকেজ নয়।
রিভিউ লিখতে বসে ছবির গল্প বলাটা আমার একেবারে না পসন্দ, তবে যেহেতু এই ছবিতে ‘গপ্প’ সেরকম কিছুই নেই,তাই একটু বলি। ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং বাসবদত্তা শহুরে দম্পতি।সিনেমার ব্যাকড্রপে আর্থিক মন্দার কালো ছায়া।তাই পেটের দায়ে দুজনকে দুটি আলাদা শিফটে কাজ করতে হয়।বাসবদত্তা একটি ব্যাগের কারখানায় সুপারভাইজার, ঋত্বিক একটি ছাপাখানায় কাজ করেন,যেখানে সারারাত খবরের কাগজ ছাপা হয়।আলাদা শিফটে কাজ করার দরুণ এদের দেখা হয় না।কচ্চিৎ কদাচিৎ দুই শিফটের মাঝে মিনিট দশেক দেখা হওয়াটাই এই শহুরে সামান্য অভাবী দম্পতির একমাত্র স্বপ্ন।ব্যাস।গল্প বলতে এটুকুই। কিন্তু সিনেমা একটি অডিও ভিসুয়াল মাধ্যম।মাধ্যমের শর্ত মেনেই সিনেমাতোগ্রাফার আদিত্য এবং মহেন্দ্র শেঠি একের পর এক দৃশ্যকল্প তৈরি করেন।প্রথমেই যা না বলে রাখলে অন্যায় হবে, প্রধান দুই চরিত্রের মুখে কোন সংলাপ বসাননি আদিত্য।কিন্তু এই ছবি নির্বাক নয় (ভাগ্যিস নয়)।শব্দহীন মানবের ভয়েড পূর্ণ করে ইস্কুলের বাচ্চাদের জাতীয় সঙ্গীত, গানের রেওয়াজ, ট্রামের যান্ত্রিক চিৎকার,এমনকি মাছের বাজারের ক্যাকোফনি ইত্যাদি শব্দ, যাদের সংলাপের গন্ডি টেনে আটকে রাখা যায় না। এমনকি প্রধান দুই চরিত্রের কোন নাম-ও নেই।(ম্যান অ্যান্ড উওম্যান বলা যায়।প্রসঙ্গত মনে পড়ল লারস ভন ত্রায়ার তাঁর অ্যান্টিক্রাইস্ট ছিবির দম্পতির-ও কোন নাম দেননি, দাম্পত্যের বীভৎসতা এবং সাফোকেশন তাঁর মতে নাম দিলে অনেকটাই গন্ডিবদ্ধ হয়ে যেতো।)সাউন্ড ডিজাইনার অনীশ জন এই ছবির জন্যে জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন।তাঁর কাজ এই ছবির সম্পদ।কম্পোজার হিসেবে অলকানন্দা দাসগুপ্ত বিশ্বমানের কাজ করেছেন। শুরু এবং শেষের সানাই শুনে যেন গতজন্মের স্মৃতি উঠে আসে।চোখ ভিজে ওঠে। কবুল করতে বাধ্য হচ্ছি ছবির প্রথম পাঁচ দশ মিনিট সংলাপহীন বাসবদত্তার অফিস যাওয়া এবং উত্তর কলকাতার গলি দেখতে দেখতে প্রথমে একটু অস্বস্তি হয় বৈকি, কিন্তু তারপর সিনেমা তার অডিও ভিসুয়াল মাধ্যমজাত সব সুযোগ সুবিধার সদব্যাবহার করে আমাদের ঘিরে ধরে, বিপন্ন করে।ছবিতে দুইবার ফিরে আসে ঋত্বিকের একটি স্বপ্ন। কুয়াশা ঘেরা একটি জঙ্গল। তার মাঝে আটপৌরে খাট ও ড্রেসিং টেবিল।আয়নাতে বাসবদত্তার ছেড়ে যাওয়া টিপ।ঋত্বিক দেখতে পান আয়নায় বিদ্যুতগতিতে ভেসে উঠে হারিয়ে যাওয়া বাসবদত্তার মুখ ।আমার মতো এলি তেলি দর্শকের মনে হয় এই দৃশ্য দেখার জন্যে কয়েক মাইল হাঁটা যায়। অনেক সিনেফাইল দেখলাম প্রশ্ন তুলেছেন বাসবদত্তার ও কি একই স্বপ্ন দেখা উচিত ছিলো না? সবিনয়ে বলি পরিচালক নিজেই জানিয়েছেন –ওটা যে বাসবদত্তার স্বপ্ন নয়,সেটা কোনও জায়গায় বলা নেই।সিনেমাটি চব্বিশ ঘন্টার একটি বৃত্তাকার গল্প বলে বৃত্তেই শেষ হয়।তাই পরেরদিনও একই সময় বাসবদত্তা কাজে বেরোয় বোঝাতে আবার নেপথ্যে জাতীয়সঙ্গীত শোনা যায়,অর্থাৎ পাড়ার স্কুল শুরুর সময়টুকুকে-আসা যাওয়ার মাঝের বৃত্তটি আঁকা হয়।পিছনে পড়ে থাকে লাল সিমেন্টের মেঝেতে পায়ের জলছাপ। দক্ষিণ কলকাত্তাই আনন্দবাজারী বাংলা ছবি দেখতে দেখতে ভুলতে বসেছিলাম যে আজও লক্ষীনারায়ণ ভান্ডারে মাসকাবারির বাজার আসে, কানকো টিপে কেনা হয় রুই মাছ, হাতে লেখা চেকে মাইনে হয় আমাদের এই শহরের অনেক সহনাগরিকের।
যাই লিখি না কেন ছবিটা নিয়ে যথেষ্ট হবে না। ছবিটা দেখুন দেখুন দেখুন দেখুন দেখুন দেখুন এবং দেখুন ।
পুনশ্চ – সাইকেল নিয়ে ফাঁকা বাড়িতে ঋত্বিকের ফেরা দেখতে দেখতে গ্রিক উপকথার সিসিফাসের কথা মনে পড়ছিলো। পাথর ঠেলে পাহাড়ে ওঠা ছাড়া আর মন্দার ছোঁয়াচ লাগা নিম্নমধ্যবিত্তের কি আর করার থাকে?’থাকে শুধু অন্ধকার/মুখোমুখি বসিবার’।
আর মেয়েটির ঘরে ফেরার সময় ট্রামের তারের জ্যামিতি ভবিষ্যবাণী করে পরিচালক থাকতে এসেছেন।বাড়ি ফেরার মত ঘটনা বোঝাতে স্টিলের ব্যবহার যার তার কম্মো নয়।জিনিয়াসরা মাঝে মাঝে এভাবে ছদ্মবেশে আমাদের মধ্যে ঘোরাফেরা করেন।

আপনার মতামত জানান